পাকিস্তানের বিপক্ষে নতুন অভিযানে মিরাজরা
সবুজের মাঝে বেগুনি রঙের আভা! মিরপুরের প্রিয় প্রাঙ্গণে গতকাল হাসিখুশিতে ক্যাচিং প্র্যাকটিস করেছেন সাইফ-মুস্তাফিজরা। কথা ছিল এই বেগুনি রঙের অনুশীলন জার্সি গায়ে জড়িয়েই টি২০ বিশ্বকাপ অভিযানে যাবে বাংলাদেশ দল। কথা আরও অনেক কিছুই ছিল, তবে সদ্য অতীতের ধুলোকণা ঝেড়ে আগামীর ক্যানভাসে এক নতুন সূচনার আলপনা আঁকতে চাইছে; এই বাংলাদেশ দল। আপাতত টি২০ ফরম্যাটের ঘোর কাটিয়ে ওয়ানডের প্রেমে পড়তে চাইছে, পাকিস্তানকে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ হারিয়ে র্যাঙ্কিংয়ে ৯ নম্বরে উঠতে চাইছে, আরও চাইছে নতুন বছরের প্রথম সিরিজ থেকেই তাদের আগামী বছরের ‘ওয়ানডে বিশ্বকাপ মিশন’ শুরু করতে। আর আজ প্রথম ওয়ানডেতেই পাকিস্তানকে বুঝিয়ে দিতে চাইছে ঘরের মাঠে তারা কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। ‘টি২০ বিশ্বকাপে যা হয়েছে, তারপর আমাদের ড্রেসিংরুম এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে পারা নিয়ে তারা সবাই উদগ্রীব। সামনে ওয়ানডে বিশ্বকাপ থাকায় এখন থেকেই আমাদের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। বর্তমান দলে যারা আছেন, তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মানিয়ে নিতে হবে।’ অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ গতকাল সংবাদ সম্মেলনে অফিসিয়ালি বাংলাদেশ দলের ২০২৭ বিশ্বকাপের জন্য নবযাত্রার ঘোষণা দিলেন। যেখানে সরাসরি সুযোগ পেতে এ বছর ২৩টি ওডিআই ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন মিরাজরা।
একই সুর ছিল পাকিস্তান অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদির জন্যও। যদিও র্যাঙ্কিংয়ে চার নম্বরে থাকায় তাদের এই সিরিজে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার কোনো অঙ্ক নেই। তবে তারা এসেছে ভবিষ্যতের একটি দল গড়তে, দলের ছয় ক্রিকেটারকে এই সিরিজে অভিষিক্ত করানোর অভিপ্রায় নিয়ে। তাহলে কি বাংলাদেশ সিরিজটাকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছে পাকিস্তান? বাবর আজম-সায়েম আইয়ুবদের বাদ দিয়ে এজন্যই শামায়েল হোসেন আর আব্দুল সামাদদের মতো নতুন মুখ নিয়ে এসেছে এই সিরিজে? এটি অস্বীকার করেননি পাকিস্তান অধিনায়ক। ‘আমরা বিশ্বকাপ সামনে রেখেই নতুন একটি কম্বিনেশন খুঁজছি। সে কারণেই নতুন অনেক প্রতিভাবান নিয়ে দলটি গড়া হয়েছে।’ পাকিস্তান যেমন নতুনদের নিয়ে স্বপ্ন দেখছে, তেমনি বাংলাদেশ দল ভরসা রেখেছে অভিজ্ঞতায়। ফিরিয়ে আনা হয়েছে লিটন দাস, আফিফ হোসেনদের। মিডল অর্ডারে এ দুজনের ওপর প্রবল আস্থা টিম ম্যানেজমেন্টের। সেই সঙ্গে মিরপুরের বাইশ গজের ভরসা। সর্বশেষ এই উঠোনে গেল অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২-১ জিতেছিলেন মিরাজরা। কিন্তু সেখানে বাইশ গজ শুধুই স্পিনারদের হয়ে কথা বলেছিল। ব্যাপারটি এতটাই মারাত্মক ছিল যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল তাদের প্রথা ভেঙে ৫০ ওভারই স্পিনার দিয়ে হাত ঘুরিয়েছিল। শাহিন আফ্রিদি অবশ্য সটান বলে দিয়েছেন কাল ওসব ভয় তাঁকে দেখিয়ে লাভ নেই। ‘পাকিস্তান দলের মূল শক্তি পেস বোলিং, সেখানে স্পিনাররা হয়তো উইকেট পাবে। তবে এটুকু বলতে পারি ৫০ ওভার স্পিনার দিয়ে বল করানোর কোনো চিন্তা করে না পাকিস্তান।’
আসলে পাকিস্তানে এই দলে ব্যাটারদের মধ্যে নতুনত্ব থাকলেও বোলারদের নামগুলো কিন্তু ভীষণ চেনা। শাহিন শাহ, হারিস রউফ, ফাহিম আশরাফ, আবরার আহমেদ– যাদের মধ্যে আবার ফাহিমরা বিপিএল খেলে গেছেন এই মিরপুর থেকে। তাই কন্ডিশন তাদের বেশ চেনা। দলটির মূল চ্যালেঞ্জ আসলে টপ অর্ডার ব্যাটিংয়ে, যেখানে সাহিবজাদা ফারহানের আজ অভিষেক হতে চলেছে ওডিআইতে। সেই সঙ্গে ওপেনার শামায়েল হোসেনেরও, যিনি কিনা সদ্য পাকিস্তান শাহিনসের হয়ে ইংল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে ৩৯ বলে ৫৭ রানের একটি দারুণ ইনিংস খেলেছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর গড় ৪৬.৩৩। শাহিন শাহ আফ্রিদির ইঙ্গিত আজকের ম্যাচে তিনজনের অভিষেক হতে পারে। যার মধ্যে এই দুই ওপেনার ছাড়াও নোয়াখালীর হয়ে বিপিএল খেলে যাওয়া মাজ সাদকাতও রয়েছেন। এমনিতে দুই দলের ওয়ানডেতে মুখোমুখি হওয়ার ইতিহাস ৩৯ বারের, যার মধ্যে বাংলাদেশের জয় পাঁচটিতে। ১১ বছর আগে বাংলাদেশ সফরে ওডিআই সিরিজ খেলে যাওয়া শরফরাজদের দলটিকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়েছিলেন তখনকার সদ্য দলে আসা সৌম্য, নাসির, সাব্বিররা।
এবারও কি তেমন কোনো নাম উঠে আসতে পারে এই সিরিজ থেকে? কোনো ব্র্যান্ড? সংবাদ সম্মেলনে করা প্রশ্নটি ঠিক বুঝতে পারেননি অধিনায়ক মিরাজ। তিনি বলে গিয়েছেন এই সিরিজ থেকেই আগামী বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার লক্ষ্য, দলের ব্যাটিং অর্ডার, নিজের ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে। গেল সিরিজে উইন্ডিজের সঙ্গে সৌম্য-সাইফ ওপেনিং জুটিতে শেষ ম্যাচে ২৯৮ রান তুলছিল দল এই মিরপুর থেকে। তবে আজ সেই একই জুটি থাকবে কিনা তা নিশ্চিত নয়, কেননা তানজিদ তামিম সদ্য অনুশীলন ম্যাচে রান পেয়েছেন। তাই সৌম্য নেমে যেতে পারেন ওয়ান ডাউনে। এরপর নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহীদ হৃদয়, লিটনদের দেখা যেতে পারে ব্যাট হাতে। আর অধিনায়ক নিজে সাত নম্বর জায়গাটি বেছে নিয়েছেন। তিনি আশা করছেন অতীতের মতো মিরপুরের পিচকে যেন ‘স্লো অ্যান্ড লো’ অপবাদ না নিতে হয়। ‘হোম অ্যাডভান্টেজ অবশ্যই চাই, তবে সেটা যেন স্পোর্টিং পিচ হয়।’ মিরাজের মতো শাহিন শাহ আফ্রিদিরও অনুমান পিচে পেসারদের জন্য কিছু থাকবে। আর তেমনটি হলে মিরপুরে কত রান উঠতে পারে? পরিসংখ্যান বলে সর্বশেষ ১০ ওয়ানডের সাতটিতেই পঞ্চাশ ওভার পর্যন্ত ব্যাটিংই করতে পারেনি বাংলাদেশ দল। এই মিরপুরে সর্বশেষ তিন শতাধিক রানের ইনিংস খেলেছিল বাংলাদেশ এই পাকিস্তানেরই বিপক্ষে ২০১৫ সালের ১৭ এপ্রিল। ৩২৯ রানের সেই ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন মুশফিক। আর বাংলাদেশ দলের সর্বশেষ তিনশর ওপর রানের ইনিংসটি ২০২৩ সালের এশিয়া কাপে। যেখানে লাহোরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৩৩৪ রান করে বাংলাদেশ। ১১২ রানের ইনিংস খেলে সেদিন ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন আজকের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। তাই হয়তো গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বারবার বলতে থাকেন তিনি, ‘আমি আমার বর্তমান ফর্ম নিয়ে চিন্তিত না, আমি হয়তো অনেক দিন দলকে জেতাতে পারিনি, আমার ওপর প্রত্যাশা অনেক। চেষ্টা করব সেটা পূরণ করতে।’ পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজ ৩-০ বা ২-১ ব্যবধানে জিতলেই র্যাঙ্কিংয়ে দশ থেকে নয়ে উঠে যাবে বাংলাদেশ। আপাতত এটাই মিরাজদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬