অনার্স কোর্সে বাতিল হচ্ছে বাংলা-ইতিহাস-দর্শনসহ ৬ বিষয়
শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি কর্মসংস্থানের সংযোগ বাড়াতে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী, ডিগ্রি বা অনার্স কোর্স থেকে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনসহ প্রায় ৬টি মূল বিষয় বাতিল করা হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী এই বিষয়গুলোকে পরবর্তী সময়ে অন্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
একই সাথে আইটি ও কারিগরির বিষয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে। নতুন পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার সিকিউরিটি, আউটসোর্সিং ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাভিত্তিক বিষয়। এছাড়া কলেজ পর্যায়েই এখন থেকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ চালু করা, ক্যারিয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের সাতটি বিদেশি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে এখনও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং সবার মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী মূলত দেশে সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে বিশেষ নির্দেশনা দেন। পরে একাধিক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, আমরা এমন একটি নতুন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং দক্ষ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ তৈরি হবে। দৈনিক ইত্তেফাকের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা বলছেন, কর্মের সঙ্গে কোনো বাস্তব সংযোগ স্থাপন করতে পারছে না দেশের প্রচলিত সাধারণ শিক্ষা। এই কারণে দিন দিন শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার গত ১৩ বছরে আট গুণ বেড়েছে এবং দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই এখন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল।
এই সংকট কাটাতে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি ও এইচএসসির বিষয় সংখ্যা এবং পরীক্ষা গ্রহণের মোট কর্মদিবস উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি প্রাথমিক ধারণাপত্র ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে। এনসিটিবি সূত্র জানায়, বর্তমানে একটি এসএসসি পরীক্ষা শেষ করতে ২৫ থেকে ৩০ কর্মদিবস এবং এইচএসসিতে ৩০ থেকে ৩৫ কর্মদিবস বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় হাজার হাজার স্কুলে স্বাভাবিক পাঠদান সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এতে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখন ঘণ্টা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি দীর্ঘ পরীক্ষার কারণে পরীক্ষার্থীরাও অসহনীয় মানসিক চাপে ভোগে। এই জটলা ও চাপ কাটানোই সরকারের নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
সরকার ২০২৮ সাল থেকে যে সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তাতে নতুন চারটি বিষয় যুক্ত করার কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এর মধ্যে ক্রীড়া ও সংস্কৃতি নিয়ে দুটি ভিন্ন বিষয় পড়তে হবে চতুর্থ শ্রেণি থেকে। আর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে যুক্ত হবে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’। এছাড়া নতুন শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজি ছাড়াও তৃতীয় একটি আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে, যার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি বিষয়ের সঙ্গে বড় একটি অধ্যায় যুক্ত করা হতে পারে।
গতকাল সোমবার বিকালে সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, আমরা প্রথমত বিদ্যমান শিক্ষাক্রমকে সঠিকভাবে পরিমার্জন করে, বাস্তবসম্মতভাবে এটাকে রিভাইজ করে ২০২৭ সালে দিচ্ছি। আর সম্পূর্ণ পরিবর্তনের যে বিষয়টি ভাবা হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। ২০২৮ সালে গিয়ে আপনারা সেটা সরাসরি দেখতে পারবেন, এখন নয়। কারিকুলাম খুব সুন্দর হচ্ছে এবং এতে নতুন চারটি বিষয় যুক্ত হচ্ছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন নতুন শিক্ষাক্রমে চারটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানান। তিনি বলেন, বিগত ১৬ বছরের সব সমস্যা হয়তো এক দিনে বা এক বছরে সমাধান করা সম্ভব যাবে না। তবে আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা রয়েছে এবং যতটা দ্রুত সম্ভব আমরা শিক্ষায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনব। এখানে কারিকুলামের ভেতরে একটি অংশ রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও পরিমার্জন করতে হবে, যার পাশাপাশি নতুন কিছু বিষয় আমরা যুক্ত করছি।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬