তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন: এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৬ মে ২০২৬ ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ   |   ৪২ বার পঠিত
তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন: এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন ভারতের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সংকেত বয়ে এনেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, এই দুই রাজ্যেই গতানুগতিক রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে।  

একদিকে তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়-এর নবগঠিত দল 'তামিঝাগা ভেট্রি কাজাগাম (TVK)' গত কয়েক দশকের ডিএমকে (DMK) ও এআইএডিএমকে (AIADMK) দ্বিমেরু রাজনীতি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে; অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় ও বিজেপির উত্থান জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন কম্পন সৃষ্টি করেছে।

তামিলনাড়ুর লড়াই: রুপোলি পর্দার ‘থালাপতি’ এখন রাজনীতির রাজা

তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণী সুপারস্টার বিজয়ের দল TVK মোট '১০৮টি আসন' পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২৩৪ সদস্যের তামিলনাড়ু বিধানসভায় ম্যাজিক ফিগার ১১৮ হলেও, বিজয় এখন সরকার গঠনের দোরগোড়ায়।

কংগ্রেসের সমর্থন চাইলেন বিজয়

দিল্লিতে এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক 'কে.সি. বেণুগোপাল'জানিয়েছেন যে, বিজয় আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসের সমর্থন চেয়েছেন। যদিও তামিলনাড়ুতে কংগ্রেস ঐতিহ্যগতভাবে ডিএমকে-র জোটসঙ্গী ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা বিজয়ের পাশে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেণুগোপাল বলেন, 'তামিলনাড়ুর মানুষ একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছেন এবং আমরা রাজ্যে কোনোভাবেই বিজেপির প্রভাব বাড়তে দেব না।

তামিলনাড়ু কংগ্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা 'গিরীশ চোডানকর' নিশ্চিত করেছেন যে, বিজয় কংগ্রেস সভাপতিকে চিঠি লিখেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, এবার তামিলনাড়ুতে একটি 'বিজয় ঢেউ' ছিল, যার ফলে যুবক ও মহিলা ভোটাররা ঢেলে ভোট দিয়েছেন। আগামীকাল চেন্নাইতে প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে সমর্থনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিজয়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া

বিজয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'এক্স'-এ (টুইটার) এক দীর্ঘ বার্তায় ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি লেখেন, 'আমাদের দলের যাত্রার শুরুতে অনেকেই আমাদের নিয়ে উপহাস করেছিলেন। নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু তামিলনাড়ুর মানুষ মায়ের মতো আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি এই জয়কে কেবল দলের নয়, বরং গণতন্ত্রের জয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তাপ: তৃণমূলের বিপর্যয় ও মমতার অবস্থান

পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল সারা দেশকে চমকে দিয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি এখানে জয়ের স্বাদ পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি দাবি করছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়' পরাজয় স্বীকার করতে নারাজ।

আমি পদত্যাগ করব না

রাজ্য রাজনীতিতে যখন তাঁর ইস্তফার দাবি তুঙ্গে, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি পদত্যাগ করছেন না। তাঁর দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনে হারেনি বরং বিভিন্ন কারচুপির শিকার হয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপির হেভিওয়েট নেতারা যেমন অসমের মুখ্যমন্ত্রী 'হিমন্ত বিশ্ব শর্মা' এবং আইনজীবী 'মহেশ জেঠমালানি' সরব হয়েছেন। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি নিজে থেকে সরে না দাঁড়ান, তবে তাঁকে বরখাস্ত করা উচিত।

শুভেন্দু বনাম মমতা: নন্দীগ্রামের ছায়া

গণনা কেন্দ্রের ভেতর থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, বিরোধী দলনেতা 'শুভেন্দু অধিকারী' এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, "তৃণমূলের অধ্যায় এখন শেষ।" এমনকি প্রাক্তন এক ক্রিকেটার ও তৃণমূল নেতা অভিযোগ তুলেছেন যে, টিকিট দেওয়ার নাম করে দলের অন্দরে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের নজর

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই জয়কে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তান, প্রতিটি দেশের সংবাদমাধ্যমেই মোদী ম্যাজিক এবং বাংলায় বিজেপির ঐতিহাসিক উত্থান নিয়ে চর্চা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী সবচেয়ে বড় ঘটনা, যা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বিজেপির আধিপত্য আরও মজবুত করল। 

তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গ- উভয় রাজ্যই এখন এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চেন্নাইতে যখন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ওপর বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নির্ভর করছে, তখন কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা ভারতীয় রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।