দেশের পুঁজিবাজারকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও আস্থাহীনতার সংস্কৃতি দূর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি স্পষ্ট করে জানান, বিএনপির শাসনামলে যেমন শেয়ারবাজার লুটপাটের সুযোগ ছিল না, বর্তমান সরকারের অধীনেও সেই সুযোগ কাউকে দেয়া হবে না।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর ওপর বিশেষ কমিটির সুপারিশ বিবেচনার প্রস্তাব উত্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এদিন সংসদে পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
সংসদ অধিবেশনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে শেয়ারবাজার থেকে একটি বিশেষ প্রভাবশালী গোষ্ঠী প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা লুট করেছে।
এই বিশাল অংকের অর্থ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, '১৯৯৬ ও ২০১০ সালের ভয়াবহ ধসের ক্ষত এখনো বিনিয়োগকারীরা বয়ে বেড়াচ্ছেন। পূর্ববর্তী শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই লুটপাটে জড়িত ব্যবসায়ীদের কখনো আইনের আওতায় আনা হয়নি।'
রুমিন ফারহানা আরও বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই করতে পুঁজিবাজারের কোনো বিকল্প নেই। তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দক্ষ ও যোগ্য জনবল নিয়োগের মাধ্যমে বাজারকে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
বিরোধী দলের প্রস্তাবের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশেষ কমিটি ইতোমধ্যে বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, তাই নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই। তিনি আশ্বাস দেন যে, বর্তমান সরকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এবারও কেউ লুটপাটের সুযোগ পাবে না। আমরা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করছি। এরপর বিলটির ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
অধিবেশনের এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিয়োগ ও বিদায় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য স্থানে বসানো যাচ্ছে না, যার ফলে দেশের অর্থনীতির দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
এর প্রতিক্রিয়ায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নরের পারফরম্যান্স অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে উন্নত। প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, আর্থিক খাতে আর কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ হবে না। আপনারা আগামী দিনগুলোতে এর প্রমাণ পাবেন।
বিরোধী দলীয় উপনেতা ও কুমিল্লা-১১ আসনের সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বর্তমান গভর্নরের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রশ্ন তুললে অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, কোনো দলকে সমর্থন করা মানেই সেই দলের লোক হওয়া নয়। পেশাদারিত্ব ও দক্ষতাকেই নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিন পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিলের পাশাপাশি 'বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল-২০২৬' সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়। যদিও বিরোধী দলের সদস্যরা এই বিলের ওপর আলোচনার জন্য বাড়তি সময় চেয়েছিলেন এবং জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তবে তা কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়।
সংসদে উত্থাপিত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, দেশের পুঁজিবাজারকে একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে দাঁড় করানোই সরকারের বর্তমান লক্ষ্য। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে যে অস্থিতিশীলতার মধ্যে ছিলেন, তা কাটিয়ে উঠতে কঠোর আইনি সংস্কারের পথে হাঁটছে প্রশাসন। তবে বিরোধী দল মনে করে, কেবল আইন সংশোধন নয়, বরং লুটপাটে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গঠনই হবে আসল চ্যালেঞ্জ।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে শেষ পর্যন্ত এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, বর্তমান প্রশাসন আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে আপসহীন ভূমিকা পালন করবে এবং অতীতের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।