সরকার গঠনের পর এবার দল পুর্নগঠনে মনোযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। দলটির কার্যক্রম আরো গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি পুর্নগঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। বিশেষ করে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতারা সংসদ সদস্য হওয়ায় তাদের উপর রাষ্ট্রীয় কাজের চাপ বেড়েছে। তাই এসব সংগঠনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় পর্যাপ্ত সময় দেয়া সম্ভব হচ্ছে না শীর্ষ নেতৃত্বের। ফলে সাংগঠনিক কাজকে গতিশীল রাখতে ও নতুন নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে শীগ্রই করা হবে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি।
অঙ্গ সংগঠনগুলোর কমিটি পুর্নগঠনের ব্যাপারে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ইতিবাচক মনোভাবের খবর জেনে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙাভাব তৈরি হয়েছে। পদ-পদবির জন্য তাদের তৎপরতাও বেড়েছে। বিশেষ করে কাঙ্ক্ষিত পদের জন্য জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশীদের ব্যস্ততা বেড়েছে কয়েকগুণ। অনেকেই বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে তাদের ভূমিকার কথা নানাভাবে বিএনপি হাইকমান্ডসহ নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ধরে নিয়েছেন আসন্ন ঈদুল আজহার আগে কিংবা পরে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। তাই জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে তদবির লবিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন পদপ্রত্যাশীরা।
সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গত এপ্রিলের প্রথম থেকেই অঙ্গ সংগঠনগুলো ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। সে লক্ষ্যে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠক থেকে আভাস মিলেছে, ত্যাগী, যোগ্য ও তরুণদের দিয়ে সংগঠনে বড় পরিবর্তন আনা হবে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, দলীয় অঙ্গ সংগঠনের পুনর্গঠনের কার্যক্রম চলমান আছে। তবে কবে নাগাদ নতুন কমিটি আসবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে কাজ করছেন। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যেই অঙ্গ সংগঠন পুনর্গঠন হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সময়োপযোগী ও শক্তিশালী কমিটি গঠনই এখন প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা ইউনিটগুলোতে নতুন মুখ আনার মাধ্যমে সংগঠনে গতি ফেরানোর চেষ্টা চলছে। তারা জানান, পদায়নের ক্ষেত্রে কেবল সিনিয়রিটি নয়, গুরুত্ব পাবে বিগত আমলে মামলার সংখ্যা ও পুলিশের হাতে নির্যাতনের চিত্র। যারা বিগত কয়েক বছরে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তারাই হবেন নতুন কমিটির কান্ডারি। পদপ্রত্যাশীদের লবিং ও তদবিরেও এবার বিশেষ কড়াকড়ি থাকছে। ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের আমলনামা এখন হাইকমান্ডের টেবিলে।
বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের কমিটির মধ্যে ১০টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে নির্দিষ্ট সময় পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া বিএনপি সরকার গঠনের পর সংসদ ও মন্ত্রিসভার দায়িত্বে যুক্ত হয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতা। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের সময় ও মনোযোগ কমে গেছে। এমন বাস্তব প্রেক্ষাপটে দলীয় অঙ্গ সংগঠন পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে বিএনপি। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল পুনর্গঠনের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতীদল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দল নিয়ে কাজ করছেন দায়িত্বশীল নেতারা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান সংগঠনের বড় পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন। যোগ্য, ত্যাগী এবং তরুণদের হাতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দায়িত্ব দিতে চাচ্ছেন তিনি। তারই ধারাবাহিকতায় আগামী ৯ মে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সাংগঠনিক ইউনিটের শীর্ষ নেতাদের ঢাকায় ডেকেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। ওইদিন তিনি খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
দলের একাধিক নেতা জানান, বর্তমান কমিটির ‘সুপার ফাইভে’ থাকা নেতাদের নতুন কমিটিতে থাকা না থাকা নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। তেমনটি হলে আগামীতে নেতৃত্বের সুযোগ পাবেন বিগত দিনের বঞ্চিতরা। এতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো গতি পাবে এমন দাবিও করেন তারা।
২০২৪ সালে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে এই কমিটির মেয়াদ প্রায় ২২ মাস পার হলেও তা পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
যুবদল নেতারা বলছেন, অনুকূল পরিবেশে আংশিক কমিটি দীর্ঘদিনেও পূর্ণাঙ্গ না করার কারণে বর্তমান কমিটির ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। কয়েক মাস আগে ১৫১ সদস্যের কমিটি অনুমোদনের জন্য বিএনপি হাইকমান্ডের কাছে জমা দিলেও সেটিকে ‘মাইম্যান’ কমিটি হিসাবে উল্লেখ করছেন কেউ কেউ। এমন পরিস্থিতিতে নতুন নেতৃত্বে যুবদলের পুনর্গঠন দাবি জোরালো হচ্ছে।
বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি যুবদলের শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় আছেন, সংগঠনটির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মামুন হাসান, সাবেক ১ম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন, সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল কবীর পল, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, সাইদ ইকবাল টিটু, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল, সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
তবে শীর্ষ দুই পদের একটিতে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলের নাম গুরুত্বের সহিত শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে ছাত্রদলের শ্রাবণ-জুয়েল কমিটি বিলুপ্তের পর এখনো পর্যন্ত সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে দলের নির্বাহী কমিটিসহ কোথাও পদায়ন করা হয়নি। ফলে যুবদল অথবা স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদের একটিতে রাখা হতে পারে এই ত্যাগী ছাত্রনেতাকে। এছাড়া সংগঠনটির সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি মামুন হাসানকে মহানগর উত্তর বিএনপির শীর্ষ পদে ও ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টুকে বিএনপির পরবর্তী কাউন্সিলে বড় পদে দেখা যেতে পারে।
জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় আছেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাদরেজ জামানের নাম। এছাড়া মহানগরের সাবেক নেতা নজরুল ইসলাম নোমান, শেখ ফরিদ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে আলোচনার প্রথমদিকেই রয়েছে নাজমুল হাসান, সাইফ মাহমুদ জুয়েল, জহির উদ্দিন তুহিনের নাম। অবশ্য জুয়েলের নাম যুবদলেও আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক পদে সাইফ মাহমুদ জুয়েলের নাম তৃণমূলে আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় আছেন শ্যামল মালুম, আমান উল্লাহ আমান, মো. খোরশেদ আলম সোহেল, সালেহ মো. আদনান, এসএম আবু জাফর, শরীফ প্রধান শুভ, মনজুরুল আলম রিয়াদ, ইজাজুল কবির রুয়েল, মোস্তাফিজুর রহমান, মমিনুল ইসলাম জিসান, ফারুক হোসেন, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, আজিজুল হক জিয়ন, ডা. আউয়ালসহ আরো বেশ কয়েকজন।