দীর্ঘ ১৯ বছর পর কোনো ব্রিটিশ শাসকের প্রথম মার্কিন সফর হিসেবে রাজা তৃতীয় চার্লস এবং রানী কামিলা চার দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন। এর আগে সর্বশেষ ২০০৭ সালে প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ আমেরিকা সফর করেছিলেন।
সোমবার তারা মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রুজ সামরিক বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেন। সেখানে তাদের লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এরপর হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
গত শনিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠানে গুলির ঘটনার পর পুরো শহরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার করা হয়েছে। এই থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই রাজার এই সফর বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। মঙ্গলবার রাজা চার্লস মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দেবেন এবং ধারণা করা হচ্ছে যে তিনি শনিবারের সেই হামলার ঘটনায় গভীর সমবেদনা প্রকাশ করবেন।
রাজার ভাষণের মূল প্রতিপাদ্য হতে যাচ্ছে—বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের সময়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া। রাজকীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, তিনি বলবেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যে বর্তমান কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও, বারবার আমাদের দুই দেশ একত্রে চলার পথ খুঁজে পেয়েছে।
তিনি মার্কিন-যুক্তরাজ্য অংশীদারিত্বের ‘পুনর্মিলন এবং নবায়নের‘ আহ্বান জানাবেন। সহনশীলতা, স্বাধীনতা এবং সাম্যের মতো অভিন্ন মূল্যবোধের পক্ষে সওয়াল করবেন। সমর্থন বা ইউক্রেনকে রক্ষা করার মাধ্যমে এই বিশ্বাসগুলোকে সমুন্নত রাখার আহ্বান জানাবেন তিনি।
তিনি আইনপ্রণেতাদের বলবেন যে, এই জোটটি মূলত ‘সহমর্মিতা বৃদ্ধি, শান্তি প্রচার এবং সকল ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার‘ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে।
মেরিল্যান্ডে পৌঁছানোর পর রাজদম্পতিকে স্বাগত জানান মার্কিন প্রটোকল চিফ মনিকা ক্রাউলি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার ক্রিশ্চিয়ান টার্নার। দুই শিশু তাদের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেয় এবং সামরিক ব্যান্ড দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে।
সেখান থেকে তারা সরাসরি হোয়াইট হাউসে যান। বর্তমানে হোয়াইট হাউসে বেশ কিছু সংস্কার কাজ চললেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং মেলানিয়া ট্রাম্প সাউথ পোর্টিকোতে তাদের স্বাগত জানান।
গ্রিন রুমে চা পানের পর তাদের বাগানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাজাকে বিশেষভাবে একটি নতুন মৌচাক দেখানো হয়, যা ছোট আকারের হোয়াইট হাউসের আদলে তৈরি করা হয়েছে। রাজা চার্লস মৌমাছি পালনের একজন উৎসাহী সমর্থক হওয়ায় এই ‘মধু-মাখা কূটনীতি‘তাকে বেশ মুগ্ধ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সফরকালে রানী কামিলা একটি বিশেষ ব্রোচ পরিধান করেছিলেন যাতে ব্রিটিশ এবং মার্কিন পতাকার সংমিশ্রণ রয়েছে। এটি ১৯৫৭ সালে নিউইয়র্কের মেয়র প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে উপহার দিয়েছিলেন।
১৯৫৭ সালের সেই সফরটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের পর দুই দেশের তিক্ত সম্পর্ক মেরামত করতে রানী সেই মিশন চালিয়েছিলেন। বর্তমান সফরটিকেও আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির প্রাক্কালে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করার একটি ‘সফট পাওয়ার ‘প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজা ও রানী ওয়াশিংটন ডিসিতে ব্রিটিশ দূতাবাসে আয়োজিত একটি বিশাল গার্ডেন পার্টিতে যোগ দেন। সেখানে রাজনীতি, বিজ্ঞান, দাতব্য সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর প্রায় ৬০০ জন বিশিষ্ট অতিথি উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী স্যান্ডউইচ এবং স্কোনস পরিবেশন করা হলেও সবার নজর ছিল গরুর মাংসের স্যান্ডউইচের দিকে। এই মাংসটি সম্প্রতি সম্পাদিত একটি চুক্তির অধীনে ব্রিটেন থেকে শুল্কমুক্ত আমদানিকৃত প্রথম ব্যাচের গরুর মাংস। এটি দুই দেশের মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি, সিনেটর টেড ক্রুজ এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ইভেট কুপার উপস্থিত ছিলেন।
রাজা চার্লসের এই সফর আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।