মক্কায় কোরবানি: লাখো পশু জবাইয়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, নিরাপদে আইডিবির কুপনে ঝুঁকছেন হাজিরা

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ০৪ মে ২০২৬ ০২:২৭ অপরাহ্ণ   |   ৪১ বার পঠিত
মক্কায় কোরবানি: লাখো পশু জবাইয়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, নিরাপদে আইডিবির কুপনে ঝুঁকছেন হাজিরা

হজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিবছর পবিত্র নগরী মক্কায় বিপুল সংখ্যক পশু কোরবানি সম্পন্ন হয়। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত, বিশেষ করে ঈদুল আজহার দিন কোরবানির মূল আনুষ্ঠানিকতা পালিত হয়। তামাত্তু ও কিরান হজ পালনকারীদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব হলেও ইফরাদ হজের ক্ষেত্রে এটি মুস্তাহাব।
 

 

চলতি বছর হজ অনুষ্ঠিত হবে ২৫ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত এবং কোরবানি কার্যক্রম শুরু হবে ২৭ মে থেকে। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭৮ হাজার ৫০০ হজযাত্রী অংশ নিচ্ছেন, যাঁদের অধিকাংশই কোরবানিতে অংশ নেবেন। বিশ্বব্যাপী লাখো হাজির অংশগ্রহণে মক্কায় কোরবানির সংখ্যা পৌঁছে যায় কয়েক লাখে। বিশাল এ কার্যক্রম পরিচালনা করে সৌদি সরকার ও ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)।
 

কোরবানির বিভিন্ন পদ্ধতি

হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে, বিশেষ করে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান ও জামারায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের পর হাজিরা কোরবানির প্রস্তুতি নেন। কোরবানির জন্য ছাগল, দুম্বা, গরু বা উট বেছে নেওয়া যায়। বাংলাদেশি হাজিদের মধ্যে ছাগল বা দুম্বা কোরবানি বেশি প্রচলিত।
 

কোরবানির ক্ষেত্রে হাজিরারা সাধারণত তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করেন—

প্রথমত, নিজে পশু কিনে নির্ধারিত জবাইখানায় কোরবানি করা। এতে নিজের পছন্দ অনুযায়ী পশু নির্বাচন করা গেলেও এটি সময়সাপেক্ষ।
 

দ্বিতীয়ত, প্রবাসীদের মাধ্যমে কোরবানি করা। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। কম খরচে কোরবানির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ বা একাধিক ব্যক্তির অর্থে সীমিত সংখ্যক পশু কোরবানি করার ঘটনা ঘটে।
 

তৃতীয়ত, আইডিবির কুপনের মাধ্যমে কোরবানি, যা বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ ও জনপ্রিয় পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। নির্ধারিত মূল্যে কুপন কিনে হাজিরা নিশ্চিন্তে কোরবানি সম্পন্ন করতে পারেন।
 

আইডিবির আদাহি প্রকল্পে আধুনিক ব্যবস্থাপনা

আইডিবির ‘আদাহি’ প্রকল্প হজের কোরবানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১৯৮৩ সাল থেকে চালু থাকা এ প্রকল্পের আওতায় নির্ধারিত মূল্যের মধ্যে পশু ক্রয়, জবাই, সংরক্ষণ এবং বিশ্বব্যাপী বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। বর্তমানে ৪০ হাজারের বেশি কর্মী এ কার্যক্রমে নিয়োজিত।
 

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ পশু কোরবানি করা হয়েছে এবং এর মাংস বিশ্বের প্রায় ১০ কোটি মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
 

শরিয়াহ অনুযায়ী পশু নির্বাচন

আইডিবির আদাহি প্রকল্পে দীর্ঘদিন কর্মরত বাংলাদেশি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাফর রহমান জানান, কোরবানির পশু অবশ্যই সুস্থ ও নির্দিষ্ট বয়সসীমার হতে হয়। সে অনুযায়ী ছাগল বা ভেড়া কমপক্ষে এক বছর, গরু দুই বছর এবং উট পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। গরু বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন।
 

ভাউচার পদ্ধতিতে সহজ কোরবানি

আইডিবির ভাউচার বা কুপন পদ্ধতিতে কোরবানি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়। হাজিরা অনুমোদিত ব্যাংক, এজেন্ট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভাউচার সংগ্রহ করতে পারেন। ভাউচারের মূল্য পশুর ধরন ও বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল হলেও একটি ভেড়ার জন্য সাধারণত প্রায় ৭২০ সৌদি রিয়াল নির্ধারণ করা হয়।
 

এই ভাউচার কোরবানির প্রমাণ হিসেবে কাজ করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাজির পক্ষ থেকে কোরবানি সম্পন্ন করে আইডিবি।
 

মাংস সংরক্ষণ ও বিশ্বব্যাপী বিতরণ

কোরবানির মাংস সাধারণত তিন ভাগে বণ্টন করা হলেও হজের ক্ষেত্রে অধিকাংশ মাংস দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। আইডিবি আধুনিক হিমাগারে মাংস সংরক্ষণ করে সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে পাঠায়। ক্যানিং ও ফ্রিজিং পদ্ধতিতে এসব মাংস আন্তর্জাতিকভাবে বিতরণ করা হয়।
 

সৌদি আরবে প্রায় ২৫০টি দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে মাংস বিতরণ করা হয়। বাংলাদেশেও ‘দুম্বার মাংস’ নামে এই মাংস বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
 

পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

কোরবানির বিশাল এ কার্যক্রমে পরিবেশ সুরক্ষায়ও নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং পশুর চর্বি থেকে প্রাকৃতিক সার তৈরি করা হয়। আধুনিক জবাইখানা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।