আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে উঠে এসেছে দেশের বিচারব্যবস্থার স্থবিরতা, সরকারি চাকরিতে বিশাল শূন্যপদ এবং বহুল প্রতিক্ষিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের সর্বশেষ আপডেট। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী এবং পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে জানান যে, দেশে বিচারপ্রার্থী মানুষের সংখ্যা এবং মামলার জট এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিএনপির সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার এক প্রশ্নের জবাবে তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে জানান, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি।’
এই বিশাল জট নিরসনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ‘৮৭১টি নতুন আদালত এবং ২৩২টি বিচারকের পদ’ সৃষ্টি করা হয়েছে। আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃজনের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান।
সিভিল ক্যাডারে ঘাটতি মেটাতে ১৫০ জন নতুন সিভিল জজ‘নিয়োগের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। আদালত পরিচালনার সহায়ক শক্তি হিসেবে জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ‘৭০৮ জন কর্মচারী‘নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে এবং আরও ৫৫৩ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক প্রশ্নের উত্তরে আইনমন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে বিচার বিভাগকে স্বাধীন হতে না দেওয়ার কোনো আইনি বাধা না থাকলেও প্রশাসনিকভাবে একে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছিল।
বিচারকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধার বদলে ‘দলীয় আনুগত্য'ছিল একমাত্র মাপকাঠি। যারা স্বাধীনভাবে বিচার করতে চেয়েছেন, তাদের শাস্তিস্বরূপ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হতো। বর্তমান সরকার এই ধারা ভেঙে সততা ও দক্ষতাকে‘মানদণ্ড করে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা এবং সরকারি দলের মনোয়ার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী রাজনৈতিক মামলা প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। মন্ত্রী স্বীকার করেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা ভুয়া বা হয়রানিমূলক মামলার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই, কারণ মামলার এজাহারে অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় লেখা থাকে না।
তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বিগত সরকারের আমলে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রত্যাহারের জন্য একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, রাজনৈতিক মামলাগুলো পরীক্ষা করে প্রত্যাহার করা হলেও কোনো হত্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে না।
মামলা নিষ্পত্তির সময়সীমা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮০ দিন এবং দায়রা আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকলেও বাস্তব প্রেক্ষাপটে জটিলতার কারণে কোনো কোনো মামলা ৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে চলে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী সংসদে বেকার যুবকদের জন্য এক আশার বার্তা নিয়ে এসেছেন। বিএনপির সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে মোট ‘৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ শূন্য‘রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এই বিশাল শূন্যপদ পূরণে সরকার ৬ মাস, ১ বছর এবং ৫ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে প্রায় ২,৮৭৯ জন এবং এক বছরের মধ্যে ৪,৪৫৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ‘৫ লাখ নতুন কর্মচারী নিয়োগ‘দেওয়া।
বিগত সরকারের আমলে বিসিএস ক্যাডার নিয়োগে দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। এছাড়া বর্তমান সরকার নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক‘কোটা পদ্ধতি অনুসরণ করছে। অবশিষ্ট ৭ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং ২ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সংসদীয় অধিবেশনে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। তিনি জানান, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ'‘প্রকল্পকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
‘প্রকল্পের মূল তথ্য:‘
প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সাল থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ডিপিপি (DPP) প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, সরকারের ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে সারাদেশে ‘১,২০৪ কিলোমিটার খাল খনন*‘করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৩৫ শতাংশ কাজ দৃশ্যমান হয়েছে। এছাড়া ২৯২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ এবং ৩১৬ কিলোমিটার নদী ড্রেজিংয়ের কাজও চলমান রয়েছে।
আজকের সংসদীয় কার্যদিবসে আইনমন্ত্রী ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার বিগত আমলের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে একটি মেধাভিত্তিক ও ন্যায়বিচার সম্পন্ন রাষ্ট্র গঠনে সচেষ্ট। একদিকে যেমন মামলার পাহাড় কমানোর চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই দুই ফ্রন্টে সরকারের সাফল্যই আগামী দিনের বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পদ্মা ব্যারেজের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা কৃষিতে বিপ্লব ঘটাবে বলে সংসদ সদস্যরা আশা প্রকাশ করেন।