দেশের জ্বালানি তেলের বাজার বর্তমানে এক রহস্যময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকরা জোর গলায় বলছেন, দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং আগামী অন্তত দুই মাস কোনো সংকট হওয়ার কথা নয়।
অথচ রাজধানীসহ সারাদেশের পেট্রোল পাম্পগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাম্পে পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘তেল নেই’ নোটিশ ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের দেওয়া তথ্যের সাথে বাস্তবতার এই চরম অমিল কেন তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মন্ত্রীদের আশ্বাস ও মজুদের পরিসংখ্যান
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীরা এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, দেশে ডিজেল, অকটেন এবং পেট্রোলের যে পরিমাণ মজুদ আছে, তা দিয়ে আগামী ৬০ দিনেরও বেশি সময় চাহিদা মেটানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেলের নিয়মিত চালান আসার প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, বর্তমানে মজুদাগারগুলোতে রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি তেল সংরক্ষিত আছে এবং আমদানির নতুন ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যদি মজুদ সত্যিই পর্যাপ্ত থাকে, তবে পাম্পগুলোতে কেন হাহাকার? কেন একটি মোটরসাইকেলের জন্য লিটারখানেক তেল পেতে তিন-চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে? তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং বাজার সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এই সংকটের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ বেরিয়ে এসেছে।
কৃত্রিম সংকট ও অসাধু সিন্ডিকেট
জ্বালানি তেলের বাজারে সবসময়ই একটি অসাধু চক্র সক্রিয় থাকে। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে বা সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটে, তখন বড় ডিলার ও পাম্প মালিকরা তেলের মজুদ সরিয়ে ফেলেন। তারা আশা করেন, কয়েকদিন পর দাম বাড়লে তারা অধিক মুনাফা করতে পারবেন। এই ‘হোর্ডিন’ বা মজুদদারির কারণেই বাজারে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়।
সরবরাহ ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা
ডিপোগুলো থেকে পাম্পে তেল পৌঁছানোর যে নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া থাকা দরকার, তাতে বড় ধরনের ত্রুটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং ট্যাঙ্কলরি মালিকদের নানা অব্যবস্থাপনার কারণে সময়মতো পাম্পে তেল পৌঁছাচ্ছে না। পাম্প মালিকদের অভিযোগ, তারা চাহিদা অনুযায়ী তেলের অর্ডার দিলেও ডিপো থেকে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ডলার সংকট ও এলসি জটিলতা
যদিও সরকার তেলের মজুদের কথা বলছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানির এলসি খুলতে ব্যাংকগুলো হিমশিম খাচ্ছে। বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় বকেয়া পরিশোধের দাবিতে তেল খালাসে দেরি করে। এই বিলম্বের প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ে।
প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত ক্রয়
গুজব জ্বালানি সংকটের অন্যতম বড় অনুঘটক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন খবর ছড়ায় যে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষ যার যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তেল সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। এই আকস্মিক বাড়তি চাহিদার চাপ সামলানোর ক্ষমতা আমাদের বর্তমান পাম্পগুলোর ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থার নেই।
ভুক্তভোগীদের দীর্ঘশ্বাস
রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকার একটি পাম্পে অপেক্ষমাণ ট্রাক চালক রহমত আলী বলেন, মন্ত্রীরা তো এসি রুমে বসে কথা বলেন, রাস্তায় এসে দেখুন আমাদের অবস্থা। পাম্পে এলে বলে তেল নেই, অথচ পাশের গলিতে চড়া দামে খোলা বাজারে তেল বিক্রি হচ্ছে। আমাদের কাজের বারোটা বেজে গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে মোটরসাইকেল আরোহী ও সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রেও। দীর্ঘ লাইনের কারণে যানজট আরও প্রকট হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে দেশের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।
সমাধানের পথ কোথায়?
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আশ্বাস বা পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার এবং কঠোর তদারকি। বিশেষজ্ঞরা নিচের সমাধানগুলোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
কঠিন তদারকি ও জবাবদিহিতা
সরকারকে প্রতিটি পাম্পের স্টক রেজিস্টার এবং বিক্রির হিসাব নিয়মিত তদারকি করতে হবে। যদি কোনো পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, তবে তাদের লাইসেন্স সাথে সাথে বাতিল করতে হবে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করতে হবে।
সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত তেল পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজড করতে হবে। কোন পাম্প কতটুকু তেল পাচ্ছে এবং কখন পাচ্ছে, তা একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে স্বচ্ছতা বাড়বে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে।
জ্বালানি বহুমুখীকরণ
তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। গণপরিবহনে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল এবং সিএনজির ব্যবহার আরও উৎসাহিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে নিজস্ব গ্যাস উত্তোলনের দিকে নজর দিতে হবে, যাতে জ্বালানির জন্য পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভর করতে না হয়।
আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার নিশ্চয়তা
জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের যোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে তেলের এলসি খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে সরবরাহ চেইনে কোনো ফাঁক না থাকে।
সরকারের দেওয়া ‘মজুদের তথ্য’ এবং পাম্পের ‘দীর্ঘ লাইন’- এই দুই মেরুর অবস্থানের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যদি সত্যিই দুই মাসের তেল মজুদ থাকে, তবে সেই তেল পাম্পে পৌঁছাতে বাধা কোথায়, তা খুঁজে বের করা সরকারের আশু কর্তব্য।
কেবল মুখে ‘মজুদ আছে’ বললে মানুষের ভোগান্তি কমবে না। তেলের লাইন ছোট না হওয়া পর্যন্ত সরকারের কোনো আশ্বাসই জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। অবিলম্বে সরবরাহ চেইনের ছিদ্রগুলো বন্ধ করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিরসন করাই এখন সময়ের দাবি।