|
প্রিন্টের সময়কালঃ ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৩:৫৫ অপরাহ্ণ     |     প্রকাশকালঃ ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

ব্যর্থ হতে চলেছে আমেরিকা-ইরান শান্তি আলোচনা!


ব্যর্থ হতে চলেছে আমেরিকা-ইরান শান্তি আলোচনা!


যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান শান্তি আলোচনা যখন গভীর সংকটের মুখে, ঠিক সেই মুহূর্তে সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন তেহরান হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং পরমাণু ইস্যুসহ বৃহত্তর শান্তি আলোচনার জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র পথ খুঁজছে

সোমবার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পুতিন এবং আরাঘচিকে বেশ ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকটি ওয়াশিংটনের প্রতি একটি সরাসরি বার্তা। গত কয়েক মাস ধরে ওমান ও কাতারের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল, তা বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের পক্ষ থেকে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করার পদক্ষেপ স্পষ্টতই তাদের বিকল্প শক্তির সন্ধানের ইঙ্গিত দেয়।

প্রেসিডেন্ট পুতিন বৈঠকের শুরুতে বলেন, ‘রাশিয়া এবং ইরানের সম্পর্ক বর্তমানে একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আমরা কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশীদার।

ইরানি আলোচকরা এখন একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করেছেন। তারা শান্তি আলোচনাকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করতে চাইছেন:

১. হরমুজ প্রণালী ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা: ‘ইরান চাইছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা কমাতে একটি আলাদা চুক্তি করতে।

২. পরমাণু ও বৃহত্তর শান্তি আলোচনা: পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব কমানোর মতো বিতর্কিত ইস্যুগুলোকে আলাদা টেবিলে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে বাইডেন প্রশাসন বা সম্ভাব্য পরবর্তী মার্কিন নেতৃত্ব এই ‘পৃথকীকরণ‘ নীতিতে খুব একটা সন্তুষ্ট নয়। ওয়াশিংটনের দাবি, যতক্ষণ না ইরান তার পরমাণু সক্ষমতা সীমিত করছে এবং ইসরায়েলের ওপর হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো খণ্ডিত চুক্তি সম্ভব নয়।

এই সফরের অন্যতম প্রধান দিক হলো সামরিক সহযোগিতা। অভিযোগ রয়েছে যে, ইরান রাশিয়াকে উন্নত ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে যা ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন S-400) এবং যুদ্ধবিমান প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আরাঘচি বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘পশ্চিমারা যদি মনে করে তারা অবরোধ বা চাপের মাধ্যমে ইরানকে একঘরে করে রাখবে, তবে তারা ভুল করছে। আমাদের কৌশলগত অংশীদারদের সাথে আমাদের সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইরানের এই দ্বিমুখী আচরণ আলোচনার টেবিলে বিশ্বস্ততা নষ্ট করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেছেন, "আমরা যখন গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত করতে চাইছি, তখন তেহরান মস্কোর সাথে মিলে নতুন কোনো সামরিক মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা করছে কি না, তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে।‘

বিশেষ করে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে রাশিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

১. জ্বালানি নিরাপত্তা:হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশের বেশি তেল সরবরাহ হয়। এখানে যেকোনো অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

২. নিষেধাজ্ঞা এড়ানো:রাশিয়া এবং ইরান—উভয় দেশই বর্তমানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে। তাদের মধ্যকার এই অর্থনৈতিক জোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় একটি সমান্তরাল ধারা তৈরির চেষ্টা করছে।

৩. আঞ্চলিক ভারসাম্য:ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি যুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে পুতিনের সমর্থন ইরানের জন্য একটি বিশাল কূটনৈতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।

সেন্ট পিটার্সবার্গের এই বৈঠক প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যার সমাধান এখন আর কেবল ওয়াশিংটন বা তেহরানের হাতে সীমাবদ্ধ নেই। মস্কোর প্রবেশ এই সমীকরণকে একটি বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছে। ইরান যেখানে নিজের শর্তে শান্তি চাইছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গ চুক্তির দাবিতে অনড়। এই অচলাবস্থা যদি না কাটে, তবে আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তাপ আরও বৃদ্ধির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।


সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির     |     প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ   +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ   +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬