হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু
দেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রকোপ ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এবং এর উপসর্গ নিয়ে আরও ৫টি শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। এর মধ্যে ১টি শিশুর মৃত্যু সরাসরি হামে আক্রান্ত হয়ে এবং বাকি ৪টি শিশুর মৃত্যু হামের উপসর্গজনিত কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক নিয়মিত বুলেটিন ও হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে থাকায় অভিভাবক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া বর্তমান প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও ১৯৪টি শিশু। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যু বর্তমান জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকেই নির্দেশ করছে।
ঢাকা বিভাগ: ৫টি মৃত্যুর মধ্যে ৩টি মৃত্যুই ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালসহ অন্যান্য বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগ: বাকি ২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। তারা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১২৫ জন শিশুর দেহে হামের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। তবে উপসর্গের সংখ্যা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, গত একদিনে সারা দেশে অন্তত ১ হাজার ১৭০ জন শিশুর মধ্যে হামের প্রাথমিক লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা গেছে।
উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের মধ্যে ৮৪৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিভাগেই ভর্তি হয়েছে ৩৫৫ জন শিশু। অর্থাৎ, দেশের মোট সংক্রমণের বড় একটি অংশই এখন রাজধানী কেন্দ্রিক। বর্তমানে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ড ও আইসোলেশন ইউনিটগুলোতে ঠাঁই নেই অবস্থা।
তবে আশার কথা এই যে, গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৮৩৬ জন শিশু। এর মধ্যে ৪২০ জনই ঢাকা বিভাগের।
গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব কত দ্রুত ছড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) কোনো গ্যাপ থাকা বা সম্প্রতি শিশুদের পুষ্টিহীনতা এই প্রাদুর্ভাবের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং বস্তিগুলোতে এই রোগের বিস্তার বেশি দেখা যাচ্ছে।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, অনেকের শরীরেই লালচে র্যাশ বা দানার পাশাপাশি প্রচণ্ড জ্বর এবং শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা রয়েছে। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, হামের কারণে নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিলে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অধিদপ্তর থেকে অভিভাবকদের প্রতি কয়েকটি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে:
টিকা নিশ্চিত করা: ৯ মাস এবং ১৫ মাস পূর্ণ হওয়া শিশুদের হামের টিকা (MR) দেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা।
উপসর্গ দেখা দিলে করণীয়: যদি শিশুর শরীরে প্রচণ্ড জ্বর, চোখ লাল হওয়া, সর্দি-কাশি এবং লালচে দানা দেখা দেয়, তবে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
আইসোলেশন: আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ শিশু থেকে আলাদা রাখা এবং ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করা।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় এখন সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সিট ও ওষুধের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
গত দেড় মাসে ১৯৪টি শিশুর উপসর্গজনিত মৃত্যু এবং ৩৯টি শিশুর হামে মৃত্যু প্রমাণ করে যে, এই রোগটিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি শিশুই যেন সঠিক সময়ে টিকা পায় এবং আক্রান্ত হলে সুচিকিৎসা নিশ্চিত হয়, সেটিই এখন রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্পাদকঃ সারোয়ার কবির | প্রকাশকঃ আমান উল্লাহ সরকার
যোগাযোগঃ স্যুইট # ০৬, লেভেল #০৯, ইস্টার্ন আরজু , শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, ৬১, বিজয়নগর, ঢাকা ১০০০, বাংলাদেশ।
মোবাইলঃ +৮৮০ ১৭১১৩১৪১৫৬, টেলিফোনঃ +৮৮০ ২২২৬৬৬৫৫৩৩
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬