জামায়াতে ইসলামী আদর্শের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ইস্যুর মাধ্যমে রাজনীতিতে নিজেদের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে। আমির ডা. শফিকুর রহমানের অধীনে দলটি ধর্মীয় পরিচয় এড়িয়ে অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট (প্রথাবিরোধী) পরিচিতি তুলে ধরছে।
জামায়াতকে ইতিহাসের দায়ভারও মেটাতে হচ্ছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে তারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। এ ছাড়া ৯০ শতাংশের বেশি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হলেও এখানে মধ্যপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ঐতিহ্য রয়েছে।
জামায়াতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইকোনমিস্ট। গত বৃহস্পতিবার অনলাইনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে তারা। এরপর শনিবার পত্রিকাটির ছাপা সংস্করণেও এটি প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় বিস্ময় ইসলামপন্থিদের উত্থান। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন।
ওই সময় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু গত মাসের নির্বাচনে জামায়াত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল হয়ে ইতিহাস গড়বে– এমনটা খুব কম মানুষই আশা করেছিলেন।
বাংলাদেশে জন্মলগ্ন থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। এর বিপরীতে জামায়াত পরিবর্তন, দুর্নীতিবিরোধী এবং সুশাসনের পক্ষের দল হিসেবে নিজেকে জাহির করছে। ওই দুটি দলই পারিবারিক ঐতিহ্যে চালিত এবং দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত।
জামায়াতের সবচেয়ে চতুর পদক্ষেপ ছিল ক্যাম্পাস রাজনীতিতে। গত বছর দলটির ছাত্র সংগঠন সব বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে। ক্যাম্পাসে কোরআনের প্রচার করার চেয়ে তাদের কর্মীরা পাঠচক্র পরিচালনা, জনকল্যাণমূলক গোষ্ঠী গঠন, হলের নষ্ট ফ্যান ঠিক করা এবং সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিল।
জামায়াত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা ছাত্রনেতাদের দল এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করেছে। এতে নতুন দলের তারকা প্রার্থীরা সরে দাঁড়ান। ছয়জন শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। তবে জামায়াতের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে পরিবর্তন আনতে পেরেছেন। অভ্যুত্থানের বিজয়ী পক্ষে নিজেদের স্থান করে নিয়েছেন। ফলে জামায়াত এখন এমন শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।
বিএনপির অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই– তাদের দর্শন আসলে কী।’ তখন তিনি একা নন, অনেকের মনে এই প্রশ্ন রয়েছে। একটি বড় সমস্যা হলো, জামায়াত এখন মধ্যপন্থি ও কট্টরপন্থিদের মধ্যে বিভক্ত। এ ছাড়া দলটির নেতার আচরণও অনিশ্চিত। মাঝেমধ্যে শফিকুর রহমান নির্ধারিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে এমন সব কথা বলেন, যা বাংলাদেশের নারীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করতে পারে। যেমন একবার তিনি বলেছিলেন, স্তন্যদানের মতো জৈবিক প্রয়োজনীয়তার কারণে নারীদের রাজনৈতিক নেতা হওয়া কঠিন (বাস্তবে কয়েক দশক নারী প্রধানমন্ত্রীরা দেশ চালিয়েছেন)।
জামায়াত আগামী নির্বাচনে জেতার স্বপ্ন দেখছে। ক্ষমতায় গেলে কী করবে– এমন প্রশ্নে শফিকুর রহমান গতানুগতিক মধ্য-ডানপন্থি মতাদর্শের কথা বলেন– ব্যবসায়ীদের সহায়তা করা, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্নীতিবাজ বা দলকানা আমলাদের দমন করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শরিয়াহ আইনের প্রতি জামায়াত অঙ্গীকারবদ্ধ। এটা মূলত ‘ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ এবং ক্ষমতার সংযম’ নিয়ে। এ ধরনের নীতি অস্পষ্ট। এর বিরোধিতা করাও কঠিন। আর সম্ভবত এটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। জামায়াত আসলে কেমন বাংলাদেশ গড়বে, তা সম্ভবত কেবল সৃষ্টিকর্তাই জানেন।