সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, চার শতাংশেরও কম। ৮৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এই নির্বাচনে। যার মধ্যে দলের হয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন ৬৬ জন নারী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ১৯ জন। নারী প্রার্থীদের মধ্যে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন। বিজয়ীদের হার মোট নারী প্রার্থীর মাত্র ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
এবারের নির্বাচনে একজন স্বতন্ত্র বাদে কেবল ক্ষমতাসীন দল বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বাকি ছয়জন নারী প্রার্থী। বিএনপি নারী প্রার্থী দিয়েছিল ১০ জন। আর প্রধান বিরোধীদলের আসনে বসা জামায়াতে ইসলামী কোনো নারীকেই প্রার্থী করেনি। এ বিষয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে ভোটের আগেই। জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অবশ্য তিনজন নারী প্রার্থী দিয়েছিল, যাদের কেউই জিততে পারেননি। একইভাবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো থেকে স্বল্পসংখ্যক নারীকে প্রার্থী করা হলেও তাদেরও কেউ নির্বাচিত হতে পারেননি। এমনকি সিংহভাগের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, চার শতাংশেরও কম। ৮৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এই নির্বাচনে। যার মধ্যে দলের হয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন ৬৬ জন নারী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ১৯ জন। নারী প্রার্থীদের মধ্যে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাতজন। বিজয়ীদের হার মোট নারী প্রার্থীর মাত্র ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
এবারের নির্বাচনে একজন স্বতন্ত্র বাদে কেবল ক্ষমতাসীন দল বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বাকি ছয়জন নারী প্রার্থী। বিএনপি নারী প্রার্থী দিয়েছিল ১০ জন। আর প্রধান বিরোধীদলের আসনে বসা জামায়াতে ইসলামী কোনো নারীকেই প্রার্থী করেনি। এ বিষয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে ভোটের আগেই। জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অবশ্য তিনজন নারী প্রার্থী দিয়েছিল, যাদের কেউই জিততে পারেননি। একইভাবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো থেকে স্বল্পসংখ্যক নারীকে প্রার্থী করা হলেও তাদেরও কেউ নির্বাচিত হতে পারেননি। এমনকি সিংহভাগের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের এই অংশগ্রহণ ও জয়লাভের হার স্বাধীনতার পর থেকে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনের তুলনায় সর্বনিম্ন। এটা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কমার উদহারণ। রাজনীতিসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তারা।
পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদে নারী সদস্য ছিলেন ১৫ জন, যা মোট সদস্যের ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। পরবর্তী কয়েক দশকে ধীরে ধীরে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদে ৩২ জন বা ৯ শতাংশ, ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদে ৩৩ জন বা ১০ শতাংশ, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে ৩৫ জন বা ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ সংসদে ৩৩ জন বা ১০ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে ৩৮ জন বা ১১ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০০১ সালে অষ্টম সংসদে ৫২ জন বা ১৫ দশমিক ১ শতাংশ, ২০০৮ সালে নবম সংসদে ৭১ জন বা ২০ শতাংশ, ২০১৪ সালে দশম সংসদে ৬৯ জন বা ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৮ সালে একাদশ সংসদে ৭২ জন বা ২০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদে ৬৯ জন বা ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। কেবল ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদে মাত্র ৪ জন বা ১ দশমিক ৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি ছিলেন। সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে মাত্র প্রায় ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত এবারের বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় নির্বাচিত সাতজন নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে তিনজনই ঠাঁই পেয়েছেন। তাদের একজন পূর্ণ মন্ত্রী ও দু’জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। অর্থাৎ, নির্বাচিত নারীদের ৪২ দশমিক ৮৬ শতাংশ এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। এই সামান্য অর্জনকে ধরে রেখেই সামনের দিনগুলোতে রাজনীতিসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত ও বৃদ্ধি করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তৃণমূল পর্যায়ে অবশ্য নারীদের রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদে সংরক্ষিত আসনে বিপুলসংখ্যক নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তাদের জন্য ভাইস চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলর বা মেম্বর পদ সংরক্ষিত আছে। আর স্থানীয় সরকারে নারীর এই উপস্থিতি রাজনৈতিক চর্চার একটি ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে গবেষণা বলছে, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই নারী জনপ্রতিনিধিরা কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পান না। পরিবার বা স্থানীয় প্রভাবশালী পুরুষ নেতারা অনানুষ্ঠানিকভাবে সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। ফলে প্রতিনিধিত্বের আড়ালে কার্যত পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো অটুট থাকে।
কেবল নির্বাচনই নয়, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে নারীদের বসানোর বিষয়টিও উপেক্ষিত রয়ে গেছে এখনও। ২০০৮ সালে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ে নারীনেতৃত্বের পরিমাণ ছিল গড়ে ১০ শতাংশ। ওই সময় নারীনেতৃত্ব তথা নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির প্রসঙ্গটি সামনে এলে ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয়সহ সব স্তরের কমিটিতেই ৩৩ শতাংশ নারীনেতৃত্ব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। কিন্তু ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে এসে দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক দলই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। যেসব রাজনৈতিক দলে নারী নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি, তাদের পরিমাণও ২০ শতাংশের বেশি নয়।
সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী নারী নেতৃত্বের এই বিধানটি না মানলে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের ক্ষমতা ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। কিন্তু ২০২০ সালের এপ্রিল-মে মাসে এসে ইসি জানায়, রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের জন্য আলাদা আইন করতে যাচ্ছে তারা। তখন ওই আইনের একটি খসড়া প্রকাশ করে রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব কার্যকরের বিধানটির সময়সীমা তুলে দেয় ইসি। তবে রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল থেকে এ সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা হয়। পরে ইসির অনুমোদিত খসড়ায় আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় ইসি।
এই অবস্থায় ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রসংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ আটমাসের আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই সনদে নারীনেতৃত্ব তথা নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির দাবিকে আরও সংকুচিত করা হয়েছে। নারীদের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন ৫০টি থেকে বাড়িয়ে ১০০টি করা এবং সরাসরি নির্বাচনে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি ছিল। কিন্তু সব রাজনৈতিক দলের আপত্তির মুখে চূড়ান্ত হওয়া জুলাই সনদে শেষপর্যন্ত সেটাকে মাত্র পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এর আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নারীদের রাখাই হয়নি। আবার জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলসহ কোনো রাজনৈতিক দলই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীদের জন্য এই ৫ শতাংশ প্রার্থী সংরক্ষণের বিষয়টিও মানেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষার পর প্রণীত জুলাই সনদের এই বিধানেও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন কমানো হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সামনের সারিতে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন। একইভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন নারীরা। কিন্তু সব আন্দোলন-সংগ্রামের পরই কেন যেন নারীরাই উপেক্ষার স্বীকার হন। এটা গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি। নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে নারীদের সরাসরি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ বৃদ্ধি এবং দলীয় কাঠামোয় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে কেবল সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করাও এখন জরুরি।
জানতে চাইলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেছেন, ৫ আগষ্ট পরবর্তি দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরে এসেছে, নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। বিএনপি ও তার সরকার নারীনেতৃত্বের বিকাশ ও ক্ষমতায়নে সবসময় উদার ছিল, আগামীতেও থাকবে। এজন্য তারা শিগগিরই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবে। যার সুফলও পাওয়া যাবে বলে আমরা আশাবাদী।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীদের সামনে এগিয়ে দিতে হবে। বিভিন্ন নির্বাচনে তাদের বেশি বেশি মনোনয়ন দিতে হবে। আরপিওতে বর্ণিত ৩৩ শতাংশ নারীনেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিধান মানতে হবে। তাহলেই রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে, তাদের ক্ষমতায়নও অনেকটাই নিশ্চিত হবে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। রাজনীতিতে তাদের অবজ্ঞা করার উপায় নেই। নারীনেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলসহ সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে চাপে রাখতে হবে। নারীদের মেধা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে দেওয়া উচিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোরই।