ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর ৭০ কিলোমিটার এলাকাসহ দেশের ছয়টি অভয়াশ্রমে জারি করা ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে। দীর্ঘ বিরতির পর আগামীকাল শুক্রবার থেকে আবারও নদীতে মাছ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন চাঁদপুরের জেলেরা। কাঙ্ক্ষিত ইলিশ আহরণের আশায় নতুন উদ্যমে নৌকা, জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম প্রস্তুত করছেন তাঁরা।
গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ বন্ধ ছিল। একই সঙ্গে ইলিশ পরিবহন, মজুত, বাজারজাত ও ক্রয়-বিক্রয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় গত তিন-চার দিন ধরে পদ্মা-মেঘনার তীরে ব্যস্ত সময় পার করছেন অর্ধলক্ষাধিক জেলে। কেউ নৌকা মেরামত করছেন, কেউ ছেঁড়া জাল সেলাই করছেন, আবার কেউ নতুন জাল নিয়ে নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জেলেদের প্রত্যাশা, এবার নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে। এতে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে ফিরতে পারবেন তাঁরা।
মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়েছে নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এ সময় পাঁচ শতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ, কয়েক লাখ মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল ও মাছ ধরার নৌকা জব্দ করা হয়েছে।
নৌ-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান চালিয়ে ১০৫টি মৎস্য মামলা করা হয়েছে। এ সময় ১ হাজার ৩০০ কেজি মা ইলিশ জব্দ করা হয়। এ ছাড়া শতাধিক জেলেকে আটক করার পাশাপাশি মাছ ধরার নৌকা ও বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নৌ-পুলিশ।
চাঁদপুর নৌ-থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আজমগীর হোসাইন বলেন, যাঁরা মাছ শিকারে ব্যর্থ হয়ে বারবার নদীতে নামার চেষ্টা করেন এবং আইন মানতে চান না, তাঁরাই মূলত অভিযান নিয়ে অপপ্রচার ও গুজব ছড়াচ্ছেন। নৌ-পুলিশের দাবি, এবার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে অভিযান সফল হয়েছে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামও অভিযান সফল হয়েছে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এত বিশাল নদী অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করা সহজ নয়। জেলা টাস্কফোর্স এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যানবাহন ও জনবলসংকট থাকা সত্ত্বেও অভিযান কঠোরভাবে পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি জানান, মা ইলিশ রক্ষায় গঠিত জেলা টাস্কফোর্সের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করেছে। ২২ দিনের অভিযানে পাঁচ শতাধিক জেলেকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া কয়েক লাখ মিটার কারেন্ট জাল ও মাছ ধরার নৌকা জব্দ করা হয়েছে এবং মামলা করা হয়েছে। অভিযানের বিভিন্ন দিনে স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকও অংশ নেন।
দীর্ঘ ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন চাঁদপুরের অনেক জেলে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ সময়ে সংসারের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। সরকারি সহায়তা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ তাঁদের।
জেলেরা জানান, একটি নৌকা, জাল ও মাছ ধরার অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত বা মেরামত করতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী ইলিশ না পেলে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হবে তাঁদের। সংসার চালানো এবং নৌকা-জাল কেনার জন্য অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। কেউ কেউ দাদনদারদের কাছ থেকেও টাকা ধার করেছেন।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলাপ্রতি ২৫ কেজি চালের সরকারি সহায়তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন বলে অভিযোগ করেছেন জেলেরা। কার্ডধারী কয়েকজন জেলের দাবি, অভিযানের সময় কিছু অসাধু জেলেকে নদীতে মাছ ধরার সুযোগ করে দিতে নৌ-পুলিশের কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু নির্দিষ্ট সময়ের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য সারা বছর অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ, জাটকা নিধন প্রতিরোধ এবং ইলিশের নিরাপদ বিচরণ ও প্রজনন নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের সরকারি সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, মা ইলিশ সংরক্ষণ ও জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞার সময় যথাক্রমে ২৫ ও ৪০ কেজি চাল দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও তা দিয়ে দীর্ঘ সময়ের সংসার চালানো কঠিন। তাই চালের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মাছ ধরার পদ্ধতি সম্পর্কে জেলেদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে মাছ আহরণ আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন রক্ষায় জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি সহায়তা যথাযথভাবে প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা শেষে পদ্মা-মেঘনায় আবারও মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। এখন তাঁদের প্রত্যাশা, নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ মিলবে এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক দুরবস্থা কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন তাঁরা।