কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:
‘ভ্যান চালায় সংসার চলে। ওর ওপরই আমরা নির্ভর। ভ্যানডা হারা গেছে। এহন আমরা চলব ক্যাম্বা? বছরের ওমাথায় একটা হারায়ছে, এ্যমাথায় এটাও হারালো।’
কথাগুলো কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের দক্ষিণ যদুবয়রা গ্রামের ৫৯ বছর বয়সী মনোয়ারা খাতুনের। তাঁর স্বামী মো. আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের (৬৬) একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি চুরি হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাঁরা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বয়স ৬৬ হলেও সংসারের দায়িত্বে এখনও ভ্যান চালাতে হয় আব্দুল্লাহকে। তাঁর চার ছেলে থাকলেও দারিদ্র্যের কারণে তাঁরা দিনমজুরের কাজ করেন। ফলে স্ত্রী, এক নাতি ও এক নাতিনসহ পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের প্রধান দায়িত্ব ছিল আব্দুল্লাহর ওপর।
গত সোমবার দুপুরে পুলিশ পরিচয়ে যাত্রী সেজে এক ব্যক্তি তাঁকে অজ্ঞান করে ভ্যানটি নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন আব্দুল্লাহ। উপজেলার পান্টি-যদুবয়রা সড়কের লালনবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও ভ্যানটির সন্ধান না পেয়ে মঙ্গলবার কুমারখালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
আব্দুল্লাহ জানান, সোমবার দুপুরে যদুবয়রার এনায়েতপুর বাজার থেকে পুলিশ পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাঁর ভ্যানে ওঠেন। লালনবাজারে পৌঁছে ওই ব্যক্তি রাস্তায় দাঁড়িয়ে অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর হঠাৎ তাঁর মাথা ঘুরতে শুরু করে এবং তিনি রাস্তায় বসে পড়েন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরলে দেখেন, স্থানীয় কয়েকজন তাঁর মাথায় পানি দিচ্ছেন। তবে পাশে থাকা ভ্যানটি নেই।
তিনি বলেন, ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হতো। সেই টাকা দিয়ে সংসারের খরচের পাশাপাশি ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতেন। এখন ভ্যান হারিয়ে যাওয়ায় তাঁর আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে আব্দুল্লাহর বাড়ি থেকেও একটি ভ্যান চুরি হয়েছিল। পরে দুটি এনজিও থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নতুন ভ্যান কেনেন তিনি। সেই ঋণ পরিশোধের আগেই আবারও চুরি হলো তাঁর একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম।
বুধবার দুপুরে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে টিনশেডের চৌচালা ঘর। বাড়ির সামনে ভ্যান রাখার জায়গা থাকলেও সেখানে কোনো ভ্যান নেই। বারান্দায় ভ্যানের চার্জার নিয়ে বসে ছিলেন বৃদ্ধ দম্পতি। তাঁদের চোখেমুখে ছিল হতাশার ছাপ।
মনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘ভ্যানই আমার সম্বল ছিল। কিন্তু এক ভ্যান কয়বার কেনা যায়? এহন আর ভ্যান কেনার মতো কোনো পরিবেশ নেই। কেউ যদি একটু সাহায্য করতনে, তাহলে আবার চলতি পারতাম।’
প্রতিবেশী আলম মণ্ডল বলেন, আব্দুল্লাহ অত্যন্ত অসহায় ও দরিদ্র মানুষ। ভ্যানটি হারিয়ে পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তিনি। একটি ভ্যানের ব্যবস্থা হলে আবারও পরিবারটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘শয়তানের নিঃশ্বাসের খপ্পরে পড়ে ভ্যান হারিয়েছেন বৃদ্ধ আব্দুল্লাহ।’ তাঁর লিখিত অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে বৃদ্ধ দম্পতির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ লিখিত আবেদন করলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে।