বিবিসি
ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বজনদের উদ্ধারে এখনও চলছে মরিয়া চেষ্টা। উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে হাজারো মানুষ দিন-রাত ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনের জীবিত ফিরে আসার আশায়। তাদেরই একজন আন্দ্রেইনা ভ্যালেরিও, যিনি বিশ্বাস করেন ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবিত রয়েছে তার প্রায় দুই বছর বয়সী ছেলে সান্তিয়াগো।
ভূমিকম্পের সময় কর্মস্থলে ছিলেন আন্দ্রেইনা। খবর পেয়ে দ্রুত শ্বশুরবাড়িতে ছুটে গেলে দেখেন, বহুতল ভবনটি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ওই ভবনেই ছিলেন তার ছেলে সান্তিয়াগো, স্বামী রামসেস মেনদোজা, শ্বশুর-শাশুড়ি, দাদা-দাদি শ্বশুর এবং ননদ। ঘটনাস্থলে তখন স্বজনদের খুঁজছিলেন তার দেবর স্যামুয়েল মেনদোজা।
শনিবার বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দ্রেইনা বলেন, এখনও তিনি আশা হারাননি। তার দাবি, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনেছেন।
তিনি বলেন, “আমি এখনও বিশ্বাস করি আমার ছেলে বেঁচে আছে। আমি একটি শিশুর কান্নার শব্দ শুনেছি। আমি মনে করি সেটি আমার ছেলেরই কান্না। আমি জানি, আমার ছেলে এবং পরিবারের সবাই এই বিপর্যয় থেকে জীবিত বেরিয়ে আসবে।”
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ভবনের নিচে আরও অন্তত দুটি শিশু আটকা পড়ে আছে। তাদের একজন নয় বছর বয়সী লুকাস এবং অন্যজন তিন বছরের আরাঞ্জা।
লা গুয়াইরার বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে খালি হাতেই ইট-পাথর সরাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিবিসির প্রতিবেদক জানিয়েছেন, অনেকেই টানা কয়েক রাত ঘুমাননি। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা স্বজনদের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে অনেকের কণ্ঠ ভেঙে গেছে।
শুক্রবার থেকে প্রতিবেশী ও স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধারকাজে যোগ দেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মানুষ ছুটে আসেন সহায়তার জন্য। তবে অনেকের অভিযোগ, এত বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল এবং উদ্ধারকাজের শুরুতে ভারী যন্ত্রপাতির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পেরিয়ে ধীরে ধীরে উদ্ধার সরঞ্জাম ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে শুরু করে।
সরকারি তথ্যমতে, লা গুয়াইরা অঙ্গরাজ্যে অন্তত ১ হাজার ৪০০টির বেশি ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫০টিরও বেশি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ এই ভূমিকম্পকে গত ১২৩ বছরের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২৩৮ জন। এছাড়া এখনও ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদারে লা গুয়াইরাজুড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, অঙ্গরাজ্যটিতে ১৪ হাজার নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি শনিবারের মধ্যে ১০টি দেশ থেকে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে সাধারণ মানুষকে লা গুয়াইরায় না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। এদিকে ধ্বংসস্তূপের পাশে অপেক্ষমাণ হাজারো স্বজন এখনও আশা ছাড়েননি। তাদের বিশ্বাস, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও জীবনের ক্ষীণ স্পন্দন রয়েছে, আর সেই আশাতেই তারা প্রহর গুনছেন প্রিয়জনের ফিরে আসার।