কমিশন বাড়াতে ব্যবসায়ীদের চাপ, এলপিজির দাম বৃদ্ধির শঙ্কা

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৫৮ অপরাহ্ণ   |   ৫২ বার পঠিত
কমিশন বাড়াতে ব্যবসায়ীদের চাপ, এলপিজির দাম বৃদ্ধির শঙ্কা

কারিগরি কমিটির সুপারিশ কার্যকর হলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম হতে পারে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা
 

এলপিজি বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিশন ও চার্জ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা। এসব দাবি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি কমিটি তুলনামূলক কম হারে কমিশন ও বিভিন্ন চার্জ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এসব সুপারিশ কার্যকর হলে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বর্তমান ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা হতে পারে। এতে নতুন করে দাম বাড়ার শঙ্কায় পড়েছেন ভোক্তারা।
 

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে এলপিজির দাম নির্ধারণের বিষয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে ব্যবসায়ীরা কমিশন ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব তুলে ধরেন। তবে বাজারে চলমান সরবরাহসংকট, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ায় শুনানিতে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা প্রতিনিধিরা।
 

তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।
 

আমদানিকারকদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব

বর্তমানে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারে আমদানিকারকদের কমিশন ২০০ টাকা। এই কমিশন বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
 

তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটি আমদানিকারকদের কমিশন ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৮০ টাকা করার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ, সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ৮০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে কমিটি।
 

অন্যদিকে, পরিবেশকেরা তাঁদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার আবেদন করেছেন। কারিগরি কমিটি খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৭০ টাকা করার সুপারিশ করলেও পরিবেশকদের কমিশন ১৫০ টাকা করার দাবির পক্ষে একই ধরনের সুপারিশ করেনি।
 

এ ছাড়া অটোগ্যাস স্টেশন মালিকেরা প্রতি লিটারে কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন।
 

বিভিন্ন পর্যায়ে চার্জ বাড়ানোর সুপারিশ

এলপিজি মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ ও পরিবহনের খরচ বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
 

বর্তমানে মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ এবং অপারেটরের প্ল্যান্ট থেকে পরিবেশক পর্যন্ত পরিবহনসহ চার্জ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা। ব্যবসায়ীরা এ চার্জ বাড়িয়ে ২৭ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ৩৬ টাকা ৯২ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে কারিগরি কমিটি প্রতি কেজিতে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা করার সুপারিশ করেছে।
 

পরিবেশক পর্যায় থেকে খুচরা বিক্রেতার আঙিনা পর্যন্ত পরিবহনসহ চার্জ বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা। ব্যবসায়ীরা তা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কারিগরি কমিটির সুপারিশে এ চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ টাকা ৬৭ পয়সা।
 

অন্যদিকে, খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। ব্যবসায়ীরা তা বাড়িয়ে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা থেকে ৭ টাকা ৫০ পয়সা করার দাবি জানিয়েছেন। কারিগরি কমিটি প্রতি কেজিতে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা করার সুপারিশ করেছে।
 

যুদ্ধ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তি ব্যবসায়ীদের

কমিশন ও চার্জ বাড়ানোর পক্ষে যুদ্ধের প্রভাব, জাহাজভাড়া, পরিবহন ব্যয় এবং পরিচালন খরচ বৃদ্ধির যুক্তি তুলে ধরেছেন ব্যবসায়ীরা।
 

মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগে জাহাজভাড়াসহ প্রিমিয়াম প্রতি টনে ৮০ থেকে ১২০ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
 

তিনি বলেন, সব ধরনের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এমনভাবে দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে কেউ নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করতে না পারে।
 

নির্ধারিত দামে গ্যাস না পাওয়ায় ক্ষোভ

ভোক্তা প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধির দাবি বিবেচনায় নেওয়া হলেও গ্রাহকেরা কেন নির্ধারিত দামে এলপিজি পাচ্ছেন না।
 

গত অক্টোবরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপরও বাজারে অনেক গ্রাহককে একটি সিলিন্ডার কিনতে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা খলিলুর রহমান শুনানিতে বলেন, এলপিজির দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করা বিইআরসির দায়িত্ব। তা না হলে এই শুনানি যথাযথ হবে না।
 

তিনি দাম না বাড়ানোর পাশাপাশি বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
 

৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ

শুনানিতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগে কয়েকটি কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সেই অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি না করেই কেন কমিশন বৃদ্ধির বিষয়ে গণশুনানি করা হচ্ছে।
 

তাঁর দাবি, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করে এক মাসে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে।
 

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খুচরা ব্যবসায়ীদের ১১ লাখ টাকা জরিমানা করলেও এর মাধ্যমে ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় বৈধ হয়ে গেছে কি না।
 

শুনানিতে এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে শুনানি বর্জনের ঘোষণা দেন তিনি।
 

সরবরাহসংকট নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

শুনানিতে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা আমদানিকারক ও অপারেটরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। তাঁদের দাবি, সরবরাহসংকট দেখা দিলে কোম্পানিগুলো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হওয়ায় বিইআরসি নির্ধারিত দামে তা বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
 

অন্যদিকে, আমদানি করতে না পারা কয়েকটি কোম্পানির পক্ষ থেকে বাজারে পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।
 

জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার তদারকি জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে।
 

১ নভেম্বর পর্যন্ত মতামত জমা দেওয়ার সময়

গণশুনানি শেষে কমিশন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে প্রস্তাবের বিষয়ে লিখিত মতামত জমা দেওয়ার জন্য আগামী ১ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে পাওয়া প্রস্তাব ও মতামত পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
 

ব্যবসায়ীদের কমিশন ও চার্জ বৃদ্ধির দাবি, কারিগরি কমিটির সুপারিশ এবং ভোক্তাদের আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।