সংবিধান সংশোধন নয়, বরং দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অর্জিত ‘জুলাই সনদ’ ও গণরায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে যে সমস্ত বিষয়ের আইনি ও নিয়মতান্ত্রিক সমাধান সম্ভব, বর্তমান রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে সেগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজপথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবের হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। আগামী ২০ জুন খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ ময়দানে ১১ দলের বিভাগীয় সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে এই প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম বিপর্যয়, একচ্ছত্র দলীয়করণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের হাজারো শহীদের রক্ত এবং ত্যাগের বিনিময়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষ একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা করেছিল। সেই রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বিএনপি ও জামায়াতসহ ৩৩টি রাজনৈতিক দল দফায় দফায় বৈঠক করে ৮৪টি সাংবিধানিক, আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়ে একমত হয়ে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি করেছিল। বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো দ্বিমত ছাড়াই এর পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। অথচ এখন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন নিয়েছে। তারা এই গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী বলে দাবি করছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ক্ষমতাসীন দল এখন কাঠামোগত মৌলিক সংস্কার (Reform) এড়িয়ে কেবল নিজেদের সুবিধামতো কিছু জোড়াতালির সংশোধন (Amendment) করতে চায়। প্রধানমন্ত্রীর সীমাহীন ক্ষমতার লাগাম টানা, উচ্চ কক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা (PR) চালু এবং বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক পদগুলোতে নিরপেক্ষ নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো থেকে বিএনপি এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে যারাই প্রধানমন্ত্রী হবেন, তাঁরাই একেকজন ‘শেখ হাসিনা’ হয়ে দেশের ওপর পুনরায় ফ্যাসিবাদী শাসন চাপিয়ে দেবেন।
বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে জনজীবন বিষিয়ে তোলা হয়েছে। এমনকি ভ্যাকসিনের অব্যবস্থাপনার কারণে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক।
অন্যদিকে, প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের সমস্ত নিয়ম তোয়াক্কা করে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতে দলীয় প্রশাসক বসিয়ে একচ্ছত্র দলীয়করণের নজির স্থাপন করা হচ্ছে। বিএনপির বর্তমান ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি মন্তব্য করেন, তাদের স্লোগান এখন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নয়, বরং ‘সবার আগে বিএনপি’ হওয়া উচিত।
সীমান্তে পুশইন এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত নেতা বলেন, খুলনার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের আয়রন মার্কেটে চাঁদা দাবির কারণে এক সপ্তাহ ধরে ৭০টি দোকান বন্ধ রয়েছে। শিশু হত্যা, লাশ উদ্ধার, মসজিদের ভেতর গুলি এবং ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো বর্বর ঘটনা এখন নিত্যদিনের চিত্র। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন আইন-শৃঙ্খলার চেয়ে সংবিধান নিয়ে বেশি ব্যস্ত। সীমান্তে পুশইন নিয়ে সংসদে কথা বলতে চাওয়া এক এমপির নোটিশ প্রত্যাহারে বাধ্য করার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা কাউকে আমাদের ওপর দাদাগিরি করতে দেব না এবং আধিপত্যবাদের সেবাদাস হব না।
আগামী ২০ জুনের খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠের সমাবেশ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এটি হবে ঐতিহাসিক এক মহাসমাবেশ। সমাবেশ সফল করতে পুলিশের পাশাপাশি ১১ দলের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল যানজট নিরসনে কাজ করবে। সার্কিট হাউজ ছাড়াও শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে প্রায় ৩০০টি হর্ন (মাইক) থাকবে, যাতে সাধারণ মানুষ দূর থেকেও নেতাদের বক্তব্য শুনতে পারেন। দুপুর ২টা থেকে আসরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত মূল সমাবেশ চলবে।
সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোবারক হোসাইনের সভাপতিত্বে এবং সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ আলমের পরিচালনায় উক্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিসসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলন শেষে নেতৃবৃন্দ নগরীর স্যার ইকবাল রোড, পিকচার প্যালেস ও বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের লিফলেট বিতরণ করেন এবং মাঠের নির্মাণাধীন বিশাল মঞ্চ পরিদর্শন করেন। আগামী শনিবারের এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেবেন সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি।