ত্রৈমাসিক রিটার্নে ভ্যাট আদায় কমেছে, মাসিক পদ্ধতি ফেরানোর আলোচনা

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:১৩ অপরাহ্ণ   |   ৪১ বার পঠিত
ত্রৈমাসিক রিটার্নে ভ্যাট আদায় কমেছে, মাসিক পদ্ধতি ফেরানোর আলোচনা

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা প্রেস

 

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। এ পরিস্থিতির পেছনে ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন জমা ও কর পরিশোধের নতুন পদ্ধতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকে।
 

এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের জন্য চালু করা তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম বাতিল করে আগের মতো মাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
 

এনবিআর সূত্র জানায়, ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে চলতি অর্থবছরের বাজেটে মাসিকের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে নতুন পদ্ধতি চালুর পর মাঠপর্যায়ে রাজস্ব তদারকি ও কর নিরীক্ষা কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়েছে বলে কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছে।
 

দুই মাসে ভ্যাট আদায় কমেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা

এনবিআরের মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ২২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে ভ্যাট আদায় কমেছে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।
 

জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০২ কোটি টাকা। গত বছরের একই মাসে এ আদায়ের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্টে আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা।
 

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভ্যাট আদায়ের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশই আসে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) থেকে। এর আওতায় রয়েছে দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান।
 

এনবিআরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আগের নিয়মে চালানভিত্তিক ভ্যাট দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা হতো। নতুন নিয়মে ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক দীর্ঘ সময় হাতে পাচ্ছেন। এতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা ভ্যাটের অর্থ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নিজেদের কাছে রাখার সুযোগ পাচ্ছে। কেউ কেউ ওই অর্থ ব্যাংকে আমানত রাখছেন কিংবা ব্যবসার অন্য কাজে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
 

তবে একই সঙ্গে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যও ত্রৈমাসিক পদ্ধতি বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, একসঙ্গে তিন মাসের ভ্যাট জমা দেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, ত্রৈমাসিক রিটার্ন ব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং রাজস্ব ঝুঁকি—দুটিই বেড়েছে। আগে সার্কেল, বিভাগ ও ইউনিটভিত্তিক মাসিক রাজস্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যেত। নতুন ব্যবস্থায় সেই সুযোগ কমে গেছে।
 

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এ কারণে আগের মাসিক পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন।
 

তবে এনবিআরের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না বলে মনে করেন। তাঁর মতে, ত্রৈমাসিক রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় রয়েছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ শেষে রাজস্ব আদায়ের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
 

নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশে নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন ইতিবাচক নয়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক ও ব্যবসায়ী নেতা মো. ফজলুল হক বলেন, পুরোনো নিয়মে ফিরলে কোনো কোনো ব্যবসায়ী লাভবান হবেন, আবার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতির স্থিতিশীলতা।
 

তিনি বলেন, একটি নীতি চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই পরিবর্তন করা ব্যবসার জন্য ভালো বার্তা দেয় না। তবে সরকারের রাজস্বের জরুরি প্রয়োজন হলে তিন মাসের পরিবর্তে মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
 

অন্যদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন ভ্যাট আদায়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ভ্যাট আদায়ের সময় ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত হয়রানি ও অনানুষ্ঠানিক খরচের মুখোমুখি হতে হয়।
 

তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বারবার নীতিমালা পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না। এতে স্বাভাবিকভাবেই রাজস্ব আদায় বাড়বে।