আবদুল হাকিম রানা, দক্ষিণ চট্রগ্রাম:
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, শিল্পায়নের সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টি—এই তিন খাতকে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বেস্ট বাংলা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ইসলামী ব্যাংকার মোহাম্মদ আবদুর রহিম খন্দকার।
সম্প্রতি মালয়েশিয়াভিত্তিক ‘ভয়েস অব হিউম্যান অ্যান্ড জাস্টিস’-এর আয়োজনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক টকশোতে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বর্তমান কর্মসংস্থান পরিস্থিতি, শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার এবং রাষ্ট্রীয় নীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
মোহাম্মদ আবদুর রহিম খন্দকার বলেন, বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের চিত্র বর্তমানে মিশ্র বাস্তবতার প্রতিফলন। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি, প্রবাসী শ্রমবাজার, পর্যটন এবং ডিজিটাল সেবাখাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং শিল্পখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্পদ। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে যোগাযোগ দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞান, ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং নেতৃত্বগুণের বিকাশ জরুরি। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী ও শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালাইসিস, সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এআই ও অটোমেশন কিছু প্রচলিত চাকরির ধরন পরিবর্তন করলেও নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে ই-কমার্স, ফিনটেক, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং অনলাইনভিত্তিক সেবাখাতে কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়বে।
ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট ওয়ার্ককে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং এবং ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তরুণরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরুণদের চাকরি খোঁজার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্যোক্তা শিক্ষা চালু করা এবং সহজ শর্তে ঋণ, স্টার্টআপ অর্থায়ন ও ব্যবসায়িক পরামর্শ সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও মূলত স্বল্প দক্ষ শ্রমশক্তি বিদেশে পাঠায়। দক্ষ কর্মী রপ্তানি বাড়াতে ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন অর্জনের বিকল্প নেই। ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, নিরাপত্তা সমস্যা ও দক্ষতার ঘাটতিকে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা ও কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে নারীরা ঘরে বসেই আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।
সরকারের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, উৎপাদনশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভিয়েতনাম, ভারত ও মালয়েশিয়ার কর্মসংস্থান মডেলের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশও কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে মোহাম্মদ আবদুর রহিম খন্দকার বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে তিনি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চান, যেখানে দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, শক্তিশালী উদ্যোক্তা সংস্কৃতি এবং কম বেকারত্বের মাধ্যমে তরুণরাই দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘আধুনিক বাংলাদেশ’-এর লেখক ও মালয়েশিয়াভিত্তিক গবেষক হুসাইন আহমাদ জীবন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন বেস্ট বাংলা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আবদুর রহিম খন্দকার।