সূর্য যখন অস্ত যেতে শুরু করে এবং শহরজুড়ে ইফতারের আজান ভেসে আসে, তখন ঢাকার নিউ মার্কেটে যেন এক ভিন্ন আবহ তৈরি হয়। ফুটপাতগুলো ভরে ওঠে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ব্যস্ততার গুঞ্জন। পরিবার, দম্পতি আর বন্ধুদের দল রাজধানীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসে। সবার লক্ষ্য একটাই— ঈদের জন্য পছন্দের পোশাক খুঁজে পাওয়া।
লাখ লাখ বাংলাদেশীর কাছে নিউ মার্কেট শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, বরং এটি এক ধরনের ঐতিহ্য।
ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই বিশাল মার্কেট দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ঈদ কেনাকাটার অন্যতম ভরসাস্থল।
সীমিত বাজেট থাকলেও, ঈদের আনন্দকে ম্লান হতে দেয় না তারা। আর এ বছর, রমজান শেষের পথে এগোতেই নিউ মার্কেটে যেন আগের চেয়ে আরও বেশি ভিড় ও আনন্দের ছাপ দেখা যাচ্ছে।
এই সপ্তাহের যে কোনো সন্ধ্যায় নিউ মার্কেটে ঢুকলে দোকানদারদের মধ্যে একটি স্বস্তির আবহ লক্ষ্য করা যায়— যেটি তারা অনেকদিন ধরেই প্রত্যাশা করছিলেন।
কয়েক বছর ধরে দামের অস্থিরতা, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। কিন্তু এবারের ঈদ মৌসুমে পরিস্থিতি যেন ভিন্ন।
নূর ম্যানশনের বাইরে ভ্যানিটি ব্যাগের একটি দোকান চালান মো. জসিম উদ্দিন। বহু বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আগের বছরের তুলনায় এ বছর বাজার স্থিতিশীল রয়েছে এবং দামও মোটামুটি একই আছে। ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করে দাম বাড়েনি। সবকিছু আগের মতোই রয়েছে।’
হেসে তিনি আরও বলেন, মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করছে।
নিউ সুপার মার্কেটে অবস্থিত ‘লিংকিন পার্ক’ নামের একটি জেন্টস পোশাকের দোকানের মালিক মোহাম্মদ রাজুও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘এ বছর বিক্রি আমার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়েও কোনো উদ্বেগ নেই।’
তিনি মনে করেন, সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও বাজারের পরিবেশকে ইতিবাচক করেছে।
মোহাম্মদ রাজু আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর, বাজার আবারও তার গতি ফিরে পেয়েছে। বাজারের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে, এমন বিষয়গুলোও স্থিতিশীল রয়েছে।
সবার আগে শিশুদের জন্য
ঈদের কেনাকাটায় আয়ের স্তর যাই হোক না কেন, একটি বিষয় সব জায়গায় একই— শিশুদের জন্য কেনাকাটা সবার আগে।
শিশুদের পোশাকের দোকান ‘কটন গ্যালারি’র মালিক মোহাম্মদ মাসুম বছরের পর বছর ধরে এই দৃশ্য দেখে আসছেন।
দোকানে ছোট ছোট পাঞ্জাবি, ফ্রক ও জুতায় ভরা তাকের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘মানুষ বিশেষভাবে তাদের বাচ্চাদের জন্যই এখানে আসেন। এই মার্কেটে ক্রেতাদের ভিড় থাকে সব সময়।’
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় নিম্ন আয়ের মানুষ নিজের জন্য কিছু কিনতে না পারলেও, সন্তানের জন্য নতুন কিছু কিনতে চেষ্টা করেন। তাই ঈদের সময় শিশুদের পোশাকের বিক্রি সব সময়ই সবচেয়ে বেশি হয়।
হালকা আবেগের সঙ্গে মোহাম্মদ মাসুম যোগ করেন, ‘এটা সত্যিই মন ছুঁয়ে যায়।’
জনসমুদ্রের গল্প
নিউ মার্কেটের প্রকৃত প্রাণ আসলে সেই মানুষগুলো, যারা দোকানের সারির ফাঁক দিয়ে হাঁটছেন, দরদাম করছেন, খুঁজছেন তাদের পছন্দের জিনিস।
মিরপুর থেকে চার বন্ধুকে নিয়ে এসেছেন মো. আরিফ। ভিড়ের মাঝেও হাসিখুশি এই তরুণদের দল। একটি শার্ট হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সাধ্যের মধ্যেই এই মার্কেটে সবকিছু পাওয়া যাচ্ছে। যা দরকার, সবই আছে এখানে।’
চট্টগ্রাম থেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন মো. জুবের। কিন্তু সুযোগ পেয়ে তিনিও চলে এসেছেন নিউ মার্কেটে। স্ত্রী পাশে দাঁড়িয়ে পোশাক দেখছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এখানে দাম তুলনামূলক কম। তাই বাড়ি ফেরার আগে এখান থেকেই ঈদের কেনাকাটা সেরে নিচ্ছি।’
রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে এসেছেন তরুণ দম্পতি হৃদয় ও মিথিলা। হাতে ইতোমধ্যেই কয়েকটি শপিং ব্যাগ।
হৃদয় বলেন, ‘কিছু কিছু জিনিসের দাম একটু বেড়েছে। তবে দাম এখনো আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে। এখানে আমরা বেশ ভালোভাবেই কেনাকাটা করতে পেরেছি।’
সবচেয়ে স্পর্শকাতর গল্পটি হয়তো কামরাঙ্গীরচরের মাকসুদ ইসলামের। তিনি নিজে কেনাকাটা করতে আসেননি।
বরং তার দুই বন্ধু পাভেন ও ফয়সালকে সহায়তা করতে এসেছেন, যারা নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থেকে ঢাকায় এসেছে।
মাকসুদ বলেন, ‘ওরা তাদের ভাইবোন আর পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছে। আমি শুধু ওদের জায়গাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছি।’
হেসে তিনি বলেন, ‘আজ আমি কিছুই কিনছি না।’
উৎসবের প্রস্তুতিতে শহর
ইফতারের অনেক পরও নিউ মার্কেট যেন ঘুমাতে চায় না। ফুটপাতে নারীদের পোশাক বিক্রি করেন মো. সুমন।
তিনি বলেন, ‘মানুষ সাধারণত ইফতারের পর আসে এবং ঈদের সময় বাজার প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকে।’
এ যেন বহু বছরের এক পরিচিত রীতি— রাতের বাতাসে নতুন কাপড়ের গন্ধ, রাস্তার খাবারের সুবাস, বাবা-মায়ের হাত ধরে ঘুরে বেড়ানো শিশু, দোকানের ভিড়ে পুরোনো বন্ধুদের হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া আর অপরিচিত মানুষদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দরদাম করা।
অনিশ্চয়তার নানা সময় পার করা এই শহরে ঈদের সময় নিউ মার্কেট যেন এক স্বস্তির নিঃশ্বাস।
দাম মোটামুটি সহনীয়, দোকানের তাক ভরা পণ্য আর ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি মিরপুর থেকে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম থেকে কামরাঙ্গীরচর— সব অঞ্চলের মানুষই এখানে যতটা পারেন সাধ্যমতো খরচ করছেন, নিজের ও প্রিয়জনদের জন্য কেনাকাটা করছেন।
নিজেদের মতো করে ঈদের আনন্দকে স্বাগত জানাচ্ছেন এই মানুষগুলো।