ফ্রান্সে ফের বিক্ষোভের শঙ্কা, দেশজুড়ে মোতায়েন ৭০ হাজার পুলিশ

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১২:২৯ অপরাহ্ণ   |   ৪৯ বার পঠিত
ফ্রান্সে ফের বিক্ষোভের শঙ্কা, দেশজুড়ে মোতায়েন ৭০ হাজার পুলিশ

বিবিসি

 

গত সপ্তাহের ভয়াবহ দাঙ্গার রেশ কাটতে না কাটতেই ফ্রান্সে আবারও দেশজুড়ে বিক্ষোভের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। সম্ভাব্য সহিংসতা ও নাশকতা ঠেকাতে শনিবার দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
 

শিক্ষার্থী, শ্রমিক ইউনিয়ন ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দ্বিতীয় দফায় এ বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে।
 

গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গার ব্যাপকতা আগে থেকে অনুমান করতে না পারায় সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় এবার আগেভাগেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
 

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেছেন, ‘আমরা কোনো কিছুই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেব না।’ তিনি জানান, ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিকল্পিত বিক্ষোভের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্র বামপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠীর পক্ষ থেকেও সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
 

বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধ

চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ঘোষণা দেন, শনিবার কেবল স্বীকৃত শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে। লিওঁ, নিস ও মনপেলিয়েরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে সব ধরনের সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
 

তবে এসব পদক্ষেপ বিক্ষোভের আয়োজকদের পিছিয়ে দিতে পারেনি। দেশজুড়ে ছোট-বড় শত শত বিক্ষোভ ও কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে। শহরভেদে সমাবেশের অনুমতি ও নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা রয়েছে। কয়েকটি শহরের মেয়র কঠোর বিধিনিষেধ বহাল রাখলেও অন্য শহরগুলোতে কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
 

মার্সেইয়ে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার আগের নির্দেশ দ্রুত প্রত্যাহার করে শ্রমিক ইউনিয়নের আয়োজিত মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, প্যারিসে শিক্ষার্থী ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমর্থনে আয়োজিত মিছিলকে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে নির্ধারিত পথে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
 

গত সপ্তাহের সহিংসতার পর ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছিল। রাজধানী প্যারিসের কিছু এলাকাও এর আওতায় ছিল। নতুন করে সহিংসতা ও লুটপাটের আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।
 

জাদুঘর বন্ধ, সরানো হয়েছে পিএসজির ম্যাচ

সম্ভাব্য সহিংসতা ও লুটপাটের আশঙ্কায় শনিবার প্যারিসের ল্যুভর, ওরসে ও পিকাসো জাদুঘর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ফুটবল ক্লাব প্যারিস সাঁ জারমাঁর (পিএসজি) নির্ধারিত ঘরের মাঠের ম্যাচ সোমবারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
 

নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের দোকানের জানালায় কাঠের পাটাতন লাগিয়েছে। গত সপ্তাহের মতো আবারও দোকানপাটে লুটপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
 

গত সপ্তাহের দাঙ্গায় বিভিন্ন দোকান লুটপাট ও ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে লিমোজ শহরের ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি ঐতিহাসিক টাউন হল পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে।
 

আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ সমর্থকেরাও

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমেই বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। শনিবারের কর্মসূচিতে পুনরুজ্জীবিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
 

প্রেসিডেন্ট মাখোঁর প্রথম মেয়াদে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল এবং জনজীবনে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল। ওই আন্দোলনে বাম ও ডান—উভয় রাজনৈতিক ধারার সমর্থকেরা অংশ নিয়েছিলেন।
 

আন্দোলনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটে শনিবারের জন্য ৫০০টির বেশি বিক্ষোভ এবং আরও প্রায় ২০০টি কর্মসূচির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে প্রেসিডেন্ট মাখোঁর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।
 

অনলাইনে দেওয়া আহ্বানে আন্দোলনকারীরা গত ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার নিন্দায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছে তারা।
 

দাঙ্গার ঘটনায় শত শত ব্যক্তির কারাদণ্ড

গত সপ্তাহের অস্থিরতার পর ফ্রান্সে বিচারিক পদক্ষেপও জোরদার করা হয়েছে। শুক্রবার দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানান, ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৩২ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৬০ জনের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
 

দ্রুত বিচার কার্যক্রমের মাধ্যমে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় কয়েক শ মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
 

লুটপাট কিংবা পুলিশের ওপর হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি চেয়ে আবেদন করতে কৌঁসুলিদের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারমন্ত্রী। সম্ভাব্য শাস্তির মধ্যে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ভোটাধিকার প্রত্যাহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের মতো ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
 

শিক্ষার্থী নেতাদের সঙ্গে মাখোঁর বৈঠক

শনিবারের বিক্ষোভের আগে শুক্রবার শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। বৈঠক শেষে শিক্ষার্থী নেতারা জানান, তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় মাখোঁ গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
 

সব মিলিয়ে, গত সপ্তাহের দাঙ্গার পর ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। নতুন করে বিক্ষোভের বিস্তার, সরকারবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা এবং সম্ভাব্য সহিংসতা মোকাবিলায় শনিবার দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।