চার দিনের সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:৪৩ অপরাহ্ণ   |   ৫৩ বার পঠিত
চার দিনের সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ঢাকা প্রেস ডেস্ক:

 

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে আজ রোববার রাতে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
 

সফরকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। পাশাপাশি জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক, বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
 

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম গত ২০ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন।
 

পররাষ্ট্রসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের সুযোগ তৈরি হবে।
 

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব

সফরের আলোচ্যসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর করা। পাশাপাশি জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হবে।
 

এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় স্থান পাবে।
 

সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন’-এর চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
 

এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা—জাইকার প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।
 

এলএনজি টার্মিনাল ও টয়োটা কারখানা পরিদর্শন

জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে। এর অংশ হিসেবে চিবা প্রিফেকচারের ফুত্তসু শহরে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন তিনি।
 

এ ছাড়া নাগোয়া শহরে পোশাক ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং টয়োটার একটি কারখানা পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
 

পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে।
 

বর্তমানে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি এই সফরে স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পৃথক চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে।
 

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
 

১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য বাংলাদেশের ১২টি অগ্রাধিকার খাতে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বেশ কিছু উদ্যোগ বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিআইজি-বি) উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
 

প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্যাকেজে পরিবহন ও নগর সংযোগ খাতে ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়িসহ সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার এবং উৎপাদন শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর ও অটোমোবাইল খাতে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
 

এ ছাড়া জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব রূপান্তরে ১.২৬ বিলিয়ন ডলার এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো উন্নয়নে ৯৪০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
 

কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, নীল অর্থনীতি, পর্যটন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতের জন্য আরও ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে।
 

রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনা

দুই দেশের আলোচনায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টাও গুরুত্ব পেতে পারে।
 

এর আগে গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে একটি অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তারেক রহমান। ওই বৈঠকে এশিয়াজুড়ে জ্বালানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন একটি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় এবারের সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
 

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী যারা

চার দিনের এ সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
 

এ ছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন।
 

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প, বিশেষ করে ঢাকা মেট্রোরেল বাস্তবায়নে জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
 

এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে জাপান সফর করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে দেশটি সফর করেছিলেন।
 

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত হবে।