দেশে প্রচলিত ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তার মতে, এ উদ্যোগ গ্রহণ করলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে, একই সঙ্গে মানিলন্ডারিং ও কালো টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি তিনি দেশে বিদ্যমান ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে ব্যাংকিং খাতকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানান।
রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।
বক্তব্যে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বর্তমানে অনেকেই ব্যাংকে টাকা না রেখে বাসাবাড়িতে নগদ অর্থ সংরক্ষণ করছেন। এছাড়া দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের কাছেও বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এ পরিস্থিতিতে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে সেই অর্থ স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, যেসব ব্যক্তি তাদের অর্থের বৈধ উৎস দেখাতে পারবেন না, তাদের জন্য ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কর পরিশোধের মাধ্যমে অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা যেতে পারে। এতে একদিকে ব্যাংকে আমানত বাড়বে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যাংকিং খাত নিয়েও সমালোচনা করেন এই সংসদ সদস্য। তার ভাষ্য, দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এমপি হলেই একটি ব্যাংক, নেতা হলেই একটি লিজিং কোম্পানি’- এ ধরনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের অর্থ দিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে খাতটিকে আরও দক্ষ ও কার্যকর করা প্রয়োজন।
অর্থ পাচার প্রসঙ্গে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বহুবার বলা হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থ ফেরত আসেনি। তার মতে, মানুষ যেখানে অর্থ নিরাপদ মনে করে, সেখানেই তা স্থানান্তর করে। তাই শুধু পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা নয়, বরং দেশে এমন আর্থিক ও আইনি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ ও অর্থ সংরক্ষণে আস্থা পায়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার যে বাজেট প্রণয়ন করেছে, তাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং যুবসমাজের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর বলেও তিনি মত দেন।
উল্লেখ্য, সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকনের এই প্রস্তাবের সঙ্গে ভারতের ২০১৬ সালের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের মিল রয়েছে। ওই বছরের ৮ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশটির প্রচলিত ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোটের আইনি বৈধতা বাতিলের ঘোষণা দেন। সে সময় এ দুটি নোট দেশটির মোট প্রচলিত নগদ অর্থের প্রায় ৮৬ শতাংশ ছিল।
ভারত সরকার কালো টাকা, জাল নোট ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং নগদনির্ভর অর্থনীতিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে ওই পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা পড়লেও ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ নোট পরবর্তীতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসে। ফলে কালো টাকা দমনে ওই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়েছিল, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে।