নিজের জীবন বাঁচাতে চুপ করে ছিলাম

  প্রিন্ট করুন   প্রকাশকালঃ ১১ জুন ২০২৬ ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ   |   ৪৩ বার পঠিত
নিজের জীবন বাঁচাতে চুপ করে ছিলাম

অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অন্তরীণ সরকার’ আখ্যা দিয়ে সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম দাবি করেছেন, আদর্শিক বিরোধিতার জেরে তাঁকে তীব্রভাবে কোণঠাসা করা হয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজের জীবন ও সম্মান বাঁচাতে তিনি একটা সময় পুরোপুরি চুপ হয়ে গেলেও তাঁর ওপর নোংরা ব্যক্তি আক্রমণ কোনোভাবেই থামছে না।

 

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি এসব বিস্ফোরক তথ্য জানান। ‘সব দোষ মাহফুজ আলমের ইতিবৃত্ত’ শিরোনামের ওই দীর্ঘ পোস্টে নিজের বিরুদ্ধে চলমান তীব্র সমালোচনা, রাজনৈতিক আক্রমণ এবং সাম্প্রতিক নানা বিতর্ক নিয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানান সাবেক এই উপদেষ্টা।

 

স্ট্যাটাসে মাহফুজ আলম লেখেন, তিনি আজ পর্যন্ত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক বক্তব্য দেননি। কিন্তু ব্যক্তি মাহফুজের বিরুদ্ধে হওয়া বিষোদগারের সিংহভাগ বা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই জুলাইয়ের কথিত পক্ষের লোকদের, বিশেষ করে জাশি, এনসিপি ও উগ্র ডানপন্থিদের করা। ফ্যাসিবাদের দোসর লীগ তো এখন আক্রমণের টাইম আর স্পেসই খুঁজে পাচ্ছে না।

 

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে নিজের দায়িত্ব পালন প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তথ্য মন্ত্রণালয়ে মাত্র ৯ মাসের দায়িত্বের জন্য যদি তিনি একাই দোষী হন, তবে তাঁর আগে ও পরের ৯ মাসের উপদেষ্টারা কেন সম্পূর্ণ দায়মুক্ত থাকবেন? তারা যদি সদিচ্ছাবান হন, তবে মাহফুজ আলমকে কেন ‘গাদ্দার’ তকমা দেওয়া হচ্ছে?

 

আদর্শিক জায়গা থেকে ‘জাশি-উগ্র ডানের’ রাজনৈতিক আদর্শের বিরুদ্ধে অতীতে বক্তব্য দিয়েছেন জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি কি শুধুই জামায়াত? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার বা অবনমনের জাশির রাজনীতি নিয়ে যদি জামায়াতকে প্রশ্ন করা অপরাধ হয়, তবে সেই একই অপরাধে জুলাইয়ের কথিত পক্ষের লিবারেল, বাম ও সেকুলারদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোও সমানভাবে দায়ী হতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তবে সেরকম কিছু করা হয়নি।

 

তিনি বলেন, জামায়াতের আদর্শিক বিরোধিতার সূত্রে যদি তিনি তথাকথিত বিভাজনের জন্য দায়ী হন, তবে এই বিভাজন এবং জুলাইয়ের আন্দোলনকে জাশির একচ্ছত্র বয়ানের খপ্পর থেকে বাঁচানোর চেষ্টার জন্য তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, তিনি কখনোই শাহবাগের ফ্যাসিবাদী জাশি-বিদ্বেষী চিন্তাকে মনে-প্রাণে সমর্থন বা এন্ডোর্স করেননি।

 

তিনি আরও উল্লেখ করেন, কিছুদিন আগেও তিনি জুলাইয়ের পক্ষের সব শক্তিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পারস্পরিক বিদ্বেষ থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পলিসি বা মতাদর্শ নিয়ে গঠনমূলক তর্ক করার বদলে একজন ব্যক্তিকে টানা প্রায় দুই বছর ধরে জাশি, এনসিপি ও উগ্র ডানপন্থিদের এভাবে লাগাতার ব্যক্তি আক্রমণ করা আসলে কীসের ইঙ্গিত দেয়, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

 

গত এক বছরে ‘জাশি, এনসিপি কিংবা উগ্র ডানপন্থিদের’ নিয়ে সরাসরি তেমন কোনো বক্তব্য দেননি উল্লেখ করে মাহফুজ আলম দাবি করেন, এই অন্তরীণ সরকারের আমলে জাশি বিরোধিতার কারণেই তাঁকে সরকারের ভেতরে চরমভাবে কোণঠাসা করা হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি নিজের জীবন ও সম্মান বাঁচাতে একদম চুপ হয়ে যান। কিন্তু এর পরও গালিবাজির নোংরা রাজনীতি কেন থামছে না, তা তাঁর বোধগম্য নয়।

 

বর্তমানে তিনি কোনো সরকারি দায়িত্বে নেই, সংসদ সদস্যও নন কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা হিসেবেও সক্রিয় নন উল্লেখ করে মাহফুজ আলম প্রশ্ন তোলেন, তবে এই জাশি, এনসিপি ও উগ্র ডানের প্রধান নিশানা কেন বারবার ব্যক্তি মাহফুজই হচ্ছেন?

 

স্ট্যাটাসের শেষ দিকে একটি ভয়ংকর অভিযোগ তুলে মাহফুজ আলম লেখেন, শিবিরের বট এবং মাঠের অ্যাক্টিভিস্টরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার তাঁর ফাঁসির দাবি তুলছেন, তাঁর মৃত্যুকামনা করছেন। এমনকি একবার তাঁর প্রতীকী জবাইও করা হয়েছে। তাঁকে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে হত্যাযোগ্য করার লেভেল অনেক আগেই পার করা হয়েছে এবং এনসিপি ও উগ্র ডানেরাও মনে মনে একই বাসনা রাখছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

‘জুলাই ধ্বংসের হোতা মাহফুজ আলম’ বলে বিরোধীরা তাঁকে অনর্থক অনেক বেশি শক্তিশালী বানাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তির খেলনা না যে একজন চাইলেই তা ধ্বংস করে ফেলবে। এসব ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়ে মূলত সমালোচকরা নিজেরাই জুলাইয়ের মহান আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের কাছে খেলো ও হাস্যকর বানিয়ে ফেলছেন।

 

সবশেষে এমন কুৎসিত ব্যক্তি আক্রমণ, গালিগালাজ ও পারস্পরিক বিদ্বেষের রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধের জোর আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, জাশি, এনসিপি ও উগ্র ডানের ব্যক্তি আক্রমণ বন্ধ হোক, এটাই তিনি মনে-প্রাণে কামনা করেন। গালিবাজি আর ব্যক্তি আক্রমণ চিরতরে বাদ দিয়ে পলিসি ও দেশের মূল মতাদর্শ নিয়ে তর্ক করে যেন সবাই মিলে একটা বেটার বা উন্নত বাংলাদেশ গড়তে পারেন, এখন সেদিকেই সবার মনোযোগ দেওয়া উচিত।